HAPPY READING...


Monday, 20 April 2020

যারা স্বপ্নমিছিলে হেঁটেছিল


হরে ল্যান্ড করল মিছরির ফ্লাইট । আজ প্রায় তিনবছর পর আবার শহরে ফেরা । ফ্লাইট মোড অফ করতেই হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ এল --- “Reached?” মিছরি উত্তর দিল, “just landed. I’ll call you.” এখনও কুয়াশার ঘুম কাটেনি কলকাতার । এয়ারপোর্টের অধিকাংশই আবছায়ায়বেশ শীত করছে । প্লেন থেকে নেমে লাগেজ বেল্টের কাছে এগিয়ে গেল । ফোনের নিউজ় অ্যাপটা খুলল । উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে দাঙ্গায় এখনও পর্যন্ত মৃত 40 । গত দুরাত এক ফোঁটাও ঘুম আসেনি । যতবার চোখ বন্ধ করেছে , ফিরে এসেছে আগুন । বাড়িগুলো জ্বলছে । সারিসারি মৃতদেহ পড়ে রয়েছে রাস্তায় । রাতে ঘুম না এলে আগে খুব একা লাগত । এখন ঘুম না এলে হোয়াটস অ্যাপ খুলে মেসেজ টাইপ করে --- জেগে আছিস?” ওইদিক থেকেও উত্তর আসে, ঘুম আসছে না ?”  মিছরি কখনও কারোর উপর নির্ভরশীল হতে চায়নি । তবে ইদানীং ওর মনে হয় কোনওভাবে কি ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে । 

পাঁচ বছর আগে কলকাতার এক ফিল্ম স্কুলে অ্যাডমিশনের ওরিয়েনটেশনে আলাপ হয়েছিল সৌভিকের সঙ্গে । ফিল্ম স্কুলের সেইবছরের মেরিট লিস্টে নাম আসেনি মিছরির । সৌভিকের অ্যাডমিশন হয়েছিল । এরপর মিছরি সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করে । একদিন ভোরের ট্রেনে শহর ছাড়ে । নিজের কাছেই প্রমিস করেছিল আর কোনওদিনও শহরে ফিরবে না ও । অথচ, এই কলকাতাই মিছরির বড় প্রিয় । প্রত্যেকটা রাস্তা, প্রত্যেকটা গাছ, ভিড় এসব কিছুই আপন । আর সবথেকে প্রিয় ছিল ওর য়ুনিভার্সিটির ক্যাম্পাস । ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটা কৃষ্ণচূড়া গাছ, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির রিডিং রুম । 

লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হল মিছরি । নেহাকে ফোন করল কলার টিউনে বাজছে জন ডেনভারের একটা গান, কান্ট্রি রোড টেক মি হোম...টু দ্য প্লেস আই বিলং ।
--- হ্যাঁ বল সুপর্ণা 
--- নেহা আমি এয়ারপোর্ট থেকে বেরোলাম । কোন বাসে উঠব তোর বাড়ি আসার জন্য ?
--- এসি 37(এ) –এ ওঠ । দেখ এয়ারপোর্টের বাইরেই বাসস্ট্যান্ড । কাউকে জিজ্ঞেস কর ।
--- হ্যাঁ দেখতে পেয়েছি । ঠিক আছে রে, পাটুলিতে নেমে তোকে ফোন করছি ।

ফোন কেটে দিয়ে বাসে উঠল মিছরি । কিছুক্ষণ পর বাস ছাড়ল । তিন বছরে কী পাল্টিয়েছে শহরটায় ? দুইদিনের জন্য শহরে ফেরা, তারপর আবার যন্ত্রের মত জীবনযাপন । এই জীবনটাই কি চেয়েছিল মিছরি নাকি একটা পাখির মত হতে চেয়েছিল । স্বপ্ন দেখতেই ভালবাসত ভীষণ । এখন স্বপ্নগুলোকে চাইলেও ছুঁয়ে দেখতে পারে না । কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল কে জানে । ঘুম ভাঙল সৌভিকের ফোনে । 

--- হ্যাঁ বল সৌভিক ।
--- কোথায় তুই এখন ।
--- বাসে, এসআরএফটিআই-র সামনে । স্বপ্নের পৃথিবীর গেটের সামনে দিয়ে যাচ্ছি ।
--- তুই এখনও সেসব ভাবিস ?
--- কেন ভাবতে বারণ আছে না কি ?
---- আরে না না । তোর সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষা করছি ।
--- আমার জন্যেও কেউ অপেক্ষা করে তবে । মুম্বই থেকে হঠাৎ শহরে এলি কেন ? এই মাসে ছবির কাজ নেই ?
--- তুই এলি কেন ? বলব বলব ছবির কাজ কী আছে । খুব অপেক্ষা করছি সুপর্ণা ।
--- কথা তো ছিলই দেখা হবে । তাই এলাম । কাল দেখা হবে । আগামীকাল সন্ধেয় ফ্লাইট ।
--- সে কী ? আর থাকবি না ? একদিনের জন্য ?
--- এই শহরে বেশদিন থাকা আমার জন্য ভাল না সৌভিক । তোকে কথা দিয়েছিলাম তাই এলাম । চল রাখি । পাটুলি এসে গিয়েছি ।
--- পাটুলি কেন ? বাড়ি যাবি না ?
--- চল টাটা । 

বাস থেকে নামল মিছরি । নেহার থেকে ঠিকানা জেনে নিয়ে রাস্তা পার হল । নেহার এই নতুন ফ্ল্যাটটা বেশ সুন্দর । দরজা খুলেই মিছরিকে জড়িয়ে ধরল নেহা । মিছরির চোখেও জল এল  । 

 ২
ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ খেল নেহা ওর জন্য পছন্দের পদগুলো রান্না করেছিল । ভাত, ডাল, আলুপোস্ত, চিঙড়ি মাছ । অনেকদিন পর আজ কেউ যত্ন করে রান্না করেছে ওর জন্য । নেহা ওকে খুব ভালবাসে ৷ পৃথিবীতে মিছরিকে যদি কেউ সবচেয়ে বেশি বুঝে থাকে, সে নেহা মিছরি কিছু না বললেও ওর মন পড়ে ফেলতে পারে ৷ প্রিয় সিনেমা থেকে প্রিয় কবিতা সবেতেই ওদের ভীষণ মিল আর ওরা ভালবাসে স্বাধীনতা,  এক স্বাধীন জীবনযাপন       
দেশে এখন খুব কঠিন এক পরিস্থিতি সেই ডিসেম্বর মাস থেকে একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন আসার পরে দেশটা কেমন দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল ওরা তো ওটাই চেয়েছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষগুলোকে নিশ্চিহ্ন যদি করে দেওয়া যায় মিছরি জানে রা প্রশ্ন পছন্দ করে না, রা চায় অনুসরণ মানুষ অন্ধের মত অনুসরণ করবে আর এইদিকে মিছরির মত যারাই প্রশ্ন করতে চাইবে তাদের ডানা ভেঙে ফেলে দেওয়া হবে ৫ জানুয়ারি জেএনইউ ক্যাম্পাসে ঢুকে মেরে গেছে ওরা আর শাহিনবাগ...লড়ছে অস্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তি হয়ে লড়ছে অধিকারের জন্য লড়ছে মিছরিরাও পাশে আছে ওদের তবু মিছরির খুব ভয় হয় এখন...মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে যায় সেইদিনটার কথা ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে আসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের সপক্ষ ও বিপক্ষ ওরা লড়ছে মরছে মানুষ মৃতদেহ দেখলে মিছরির কান্না পায় ৷ যুদ্ধ শুনলে মিছরির কান্না পায় কাউকে বলতে পারে না স্মৃতি ওকে প্রতিদিন কাঁদায় এই শহর ওকে প্রতিদিন কাঁদায় মিছরি পালিয়ে বেড়ায়

 ৩
নেহার এই এক কামরার ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর নেহা মনের মত সাজিয়েছে সবথেকে সুন্দর ওর বারান্দাটা আলো জ্বলে ফুলগাছ রাখা মনে হয় রূপকথার কোনও এক পৃষ্ঠা পক্ষীরাজ নেমে আসবে এখনই, স্বপ্নের কাছে নিয়ে যাবে ওদের মনেই হয় না,  দেশের আর এক প্রান্তে মানুষ মানুষকে কাটছে এক উগ্র জাতীয়তাবাদ দেশটাকে একটু একটু করে গ্রাস করছে
ওলড মঙ্ক ওদের দুজনেরই খুব প্রিয় গ্লাসের ওলড মঙ্ক একটু একটু মত্ত করছে সন্ধেটা নেহার প্রিয় সুমন , ঘরে বাজছে তাঁর গান
" সুপর্ণা তুই কি কোনওদিনও বাড়ি ফিরবি না?", জিজ্ঞেস করল নেহা মিছরি মাথা নেড়ে না জানাল
---  কেমন কাটছে নতুন শহরে ? তিনবছরে একবারও আমার কথা ভাবলি না দেখা করতে এলি না । এখন কার একটা প্রেমে পড়ে চলে এলি হুম ?
---  প্রেম ? তুইও তাই বলবি নেহা ? তুই তো জানিস আমি কেন শহর ছেড়ে গিয়েছিলাম । আজ়িফ ছাড়া জীবনটা কখনও ভাবতে পারিনি তোর মনে আছে ও কী সুন্দর ছবি আঁকত
--- মনে আছে আমাদের য়ুনিভার্সিটির জীবনের প্রত্যেকটা সময় মনে আছে তোদের কথা মনে আছে  আমাদের স্বপ্নের কথা এখনও মনে পড়ে       
--- আমার কান্না পায় নেহা মনে হয় বাঁচব না মনে হয় একদিন আবার সব ঠিক হয়ে যাবে তাঁরা সবাই ফিরে আসবে যাঁরা হারিয়ে গিয়েছিল ।
কান্নায় ভেঙে পড়ল মিছরি নেহা ওকে জড়িয়ে ধরল মাথায় হাত বুলিয়ে দিল "এসব আর ভাবিস না সুপর্ণা আমরাও ভাবি না আর ওরা কেসটাকে পুরো অন্যভাবে সাজালো, র মা থানায় অভিযোগ করতে গেলে ওকে মারধর করে বাড়ি পাঠানো হল কোনও মিডিয়া কভারেজ হল না আমাদের বন্ধু! আমরা ভাবতেও পারি না মুক্ত পাখির মত একটা ছেলে সারাদিন তোর সঙ্গে...আর ভাবিস না সুপর্ণা! আমরা আছি একদিন সব ঠিক হবে দেখিস "
চোখের জল মুছে গ্লাসে রাম ঢেলে নিল মিছরি "ওর দোষ কী ছিল জানিস নেহা, ও প্রশ্ন করেছিল! আমার এদের ঘেন্না হয় করুণা হয়",  মিছরি বলল নেহা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল নেহার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল মিছরি
--- আমরাও কি মিছিলে হাঁটিনি নেহা ? আমরাও কি মানুষের জন্য ভাবিনি? আজ দেশটা কেমন দুভাগে ভাগ হয়ে গেল মৃত্যুতে আমার ভয় লাগে ওঁর কথা মনে পড়ে

বৃষ্টি এল হঠাৎ জলের ছাঁট এসে লাগছিল মিছরির চোখেমুখে চোখ বন্ধ করে ও দেখতে পাচ্ছিল ক্যাম্পাসের মাঠ সেদিনই থার্ড সেমেস্টার শেষ হয়েছে রা দুজন বসে আছে সেইদিন আকাশে অনেক তারা একটুও মেঘ নেই । কাল বাড়ি ফিরে যাবে আজ়িফ । মিছরির হাত ধরে বলল, " শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা,  তিন মাস ঘুমিয়ে থাকব!"  মিছরি কে ধাক্কা দিয়ে বলল, এসব বলে নাটক করিস না মিছরির কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল বলল, "এই যে এইখানে তো ! কয়েকটা দিন আমার বাড়িতে সময় দেওয়া প্রয়োজন । হস্টেলেও আর ভাল লাগছে না । এখনও রাগ করবি ?  চলে আসব দেখিস দুই সপ্তাহ পরেই ।" মিছরি ওর মাথায় হাত রাখল । ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল, তিন সত্যি ?  খুব বেশিদিন আমি তোকে না দেখে থাকতে পারি না তুই জানিস । তাড়াতাড়ি আসবি কথা দে । তুই ছাড়া ক্যাম্পাস আমি ভাবতেও পারি না । ও মিছরির হাত ধরে বলল, কথা দিলাম বাবা । এবার একটা গান শোনা । মিছরি গাইতে শুরু করল, আভি না যাও ছোড়কার...কে দিল আভি ভরা নেহি... হঠাৎই আজ়িফের হস্টেলের বন্ধুরা এল । ওদের মধ্যে থেকেই একজন বলল, তুই এখানে প্রেম করছিস ? ওইদিকে ওরা তোকে খুঁজছে । হস্টেলে দলিত পরিবারের নতুন যে ছেলেটি এসেছে, ওর থাকা নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে । এখনই চল । মিছরির কোল থেকে মাথা তুলে নিল ও । উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল । মিছরির দিকে হাত নেড়ে বলল, আসি এখন । পরে দেখা হবে । তুই সাবধানে চলে যাস । এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে চলে গেল । ঘুরেও তাকাল না । মিছরি জানত, ওর সহপাঠী ওর সংগঠনের এই ছেলেটি ক্যাম্পাসে মিছরির পরিচিতি একটু একটু করে কমিয়ে ফেলছে । কখনও ভাল প্রেমিক হতে পারেনি । তাও ওকেই খুব ভালবাসে মিছরি । সেইদিন ফাঁকা মাঠে একা দাঁড়িয়েছিল । ঝাপসা হয়ে এসেছিল ক্যাম্পাস । চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল । চোখ খুলে বাইরে তাকাল মিছরি তখনও বৃষ্টি পড়ছে । নেহার বারান্দার আলো জ্বলছে নিভছে । মিছরির কান্না এল, এই শহর ওর থেকে নিয়েছে, ফিরিয়ে দেয়নি কিছু
---  নেহা তোর সৌভিককে মনে পড়ে ? শিলিগুড়ির ছেলেটা ফিল্ম স্কুলে আলাপ হয়েছিল ওর সঙ্গেই কাল দেখা করব!
--- হ্যাঁবলেছিলি, মনে পড়ে অল্প বেশ তবে দেখা কর ভাল তো আমরাও চাই এখন খেয়ে নিবি চল... 


চাঁদনি মেট্রোর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিছরি অল্প বৃষ্টি পড়ছে ও চেষ্টা করছে বৃষ্টির জল এড়িয়ে যেতে সৌভিককে ফোন করছে,  সে ধরছে না একটা ক্যাব সামনে এসে দাঁড়াল সৌভিক নামল মিছরির কাছে এগিয়ে এল বলল, "আরে বলিস না! শেয়ারড ক্যাব তো দেরি হয়ে গেল চল রাস্তা পার হই!" মিছরি তাকিয়ে হাসল দুজনে ব্রডওয়েতে ঢুকল রাস্তার দিকে জানলার পাশে একটা টেবিলে বসল পাঁচ বছর পর ওদের দেখা একটু অপ্রস্তুত বোধ করছিল আইসব্রেক করল সৌভিকই
---  বল সাংবাদিকতা কেমন চলছে?
---  তোর ছবি বানানো কেমন চলছে বল আগে!   
---  ছবি কই বানাচ্ছি,  ডিরেকশন টিমে কাজ করছি আর কী! নিজের পরিচিতি তৈরি করব কীভাবে তাই ভাবছি বিয়ার খাবি?
---  ঠান্ডায়?
--- বল না,  খাবি? সারাক্ষণ রাম খেতে হবে না ঠান্ডা লাগলে ডাক্তার দেখানোর দায়িত্ব আমার
মিছরি হাসল সৌভিক দুটো বিয়ার অর্ডার দিল আর ড্রাই চিলিচিকেন" আমার সাংবাদিকতা ঐ চলছে খবর সম্পাদনা করছি, সেরকম থ্রিল কই ! তুই বল কী বলছিলি !"
--- হ্যাঁ এই ফিল্ডে নিজের পরিচিতি তৈরি করাটা খুব প্রয়োজন ইন্ডাস্ট্রিতে সার্ভাইভ করতে হবে তো
--- হুম বুঝছি তো প্ল্যান কী তোর!
--- এই যে একটা আবছা আলো তোর মুখ এসে পড়ছে, এই আলোয় তোর একটা ছবি তুলব       

মিছরি হাসল বৃষ্টি এল আবার জানলার কাচের ওপাশে ভিজে যাওয়া শহরটা কী অন্যরকম লাগে মিছরি আবার ফোনের নিউজ অ্যাপ খুলল দিল্লিতে একের পর এক বাড়ছে মৃতের সংখ্যা মাঝেমধ্যে কেমন জানি অবশ লাগে ওর মনে হয়, এই জীবন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলে ভাল হত এই পৃথিবী ওদের মত মানুষের জন্য নয় "ফেসবুকে ভাইরাল ওই ভিডিয়োটা দেখেছিস? ওই যে মানুষের বুকের উপর পা তুলে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানো হচ্ছে?", প্রশ্ন করল সৌভিকমিছরি মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল" এইসব দেখলে এত রাগ হয়, মনে হয় সব তছনছ করে দিই! এই শাসন চাই না! ", সৌভিক জোরে বলে উঠল
মিছরি শান্তভাবে সৌভিকের দিকে তাকাল বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিল " নাইট অ্যান্ড ফগ" ছবিটার কথা মনে পড়ে?", প্রশ্ন করল মিছরি
--- মনে পড়ে কী, ছবিটা সঙ্গে নিয়ে বাঁচি ৷ ছবিটা সবসময় অন্যায়ের কথাগুলো মনে করিয়ে দেয় এই পৃথিবীতেই সেই সময়, অথচ কত দূরে
--- আমি যেইদিন প্রথম নাইট অ্যান্ড ফগ দেখি, আমি ঘুমাতে পারিনি কী অদ্ভুত সময়রেখা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের এক একটা অংশ আমরা দেখছি, যা বর্তমান ভয়েস ওভারে অতীতের কথা শুনছি গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছি কত মানুষ অসহায়ভাবে মারা গিয়েছেন আর যখন অতীতের ছবি দেখছি, ভয়েস ওভারে তা ঘটমান বর্তমান হয়ে ওঠে মনে হয়, সেই অত্যাচারিত মানুষগুলো আমাদের দিকেই আসছে আঙুল তুলছে পৃথিবীর দিকে, অন্যায়ের দিকে কেন পৃথিবী চুপ করেছিল? কেন রুখে দাঁড়ায়নি?
--- আমার তো সবচেয়ে কষ্ট হয় ওই লোহার তারের ব্যারিকেডের দৃশ্যটা ভাবলে শুধু বন্দুক চালানো অভ্যেস করার জন্য মানুষগুলোকে বলা হত যাও তোমরা চলে যাও...পালিয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হত...সেই লোহার তারের ব্যারিকেডে আটকে থাকত মৃতদেহ কী নির্মম! পৃথিবী তো এখনও চুপ করে আছে পৃথিবী রুখে দাঁড়াতে জানে না অসমে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে অবৈধ নাগরিকদের সেখানে নিয়ে গিয়ে রাখা হবে বা যারা নাকি ভারতের নাগরিক নয় তারা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাবে! মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ মানুষ তাই তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে
--- ওরা আসলে ভুলে যায় রাষ্ট্র কারোর ভার বহন করে না শ্রমের এই সিস্টেমে শ্রম দিলে খাবার আসে কেউ কারোর গ্রাস কেড়ে খায় না যারা এক দেশ থেকে সব ছেড়ে চলে এসেছেন, যারা বছরের পর বছর শ্রম দিয়েছেন রাষ্ট্র তাদের শ্রম ভোগ করেছে আজ তাদের নাগরিকত্বে প্রশ্ন তুলে তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠাতে চায় আমার এদের উপর করুণা হয়
---  কেন তোদের য়ুনিভার্সিটির ওই ছেলেটার কথাই বল, রুমি নামের ছেলেটা! পুরো নামটা বোধ হয়  আজ়িফ রুমি । ওকে কী করল? মিডিয়া কীভাবে সাজাল ওর কেসটা? ছিঃ!
মিছরি চমকে গিয়ে সৌভিকের দিকে তাকাল মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকল বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে "কী হল সুপর্না?" মিছরি নীরব বসে রইল এই শহর তবে রুমিকে মনে রেখেছে আজ তিনবছর পরেও সবাই তবে রুমিকে ভুলে যায়নি এখনও মানুষ ভাবছে যে সেদিন অন্যায় হয়েছিল মিছরির হাতের উপর হাত রাখল সৌভিক মিছরি শক্ত করে চেপে ধরল সৌভিকের হাত ওর চোখ থেকে জল পড়ছিল আজ মনে হল, না ওরা কজনই না এখনও শহরের অনেকেই রুমিকে মনে রেখেছে রুমি ছাড়া জীবনটা কখনও ভাবতে পারনি মিছরি রুমির হারিয়ে যাওয়ার পর পাশে দাঁড়ায়নি পরিবার, মিডিয়ার সামনে কথা বলতে দেয়নি । তাঁদের কাছে ফিরব? বারবার নিজেকে একই প্রশ্ন করেছে এই তিন বছরে । মিছরির মনে হল আর বাঁচবে না । যদিও ও এখনও বিশ্বাস করে রুমি আবার ফিরে আসবে
ক্যাম্পাসে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা সংখ্যায় বাড়ছিল ওদের বাইরে থেকেও সমর্থন ছিল মিছরিরাোঝেনি রুমি সবার প্রিয় ছিল মিছরি কোনওদিন ভাবনি, ওর কী ধর্ম রা তো মানবধর্মে বিশ্বাসী শুধু ভালবেসেছিল রুমিও বোঝেনি ওর শত্রু তৈরি হয়েছিল সেইদিনও বলেছিল, কদিনের জন্য বাড়ি ফিরে যাবে একদিন বিকেলে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে অটোয় উঠলহাত নেড়ে বলল, আবার দেখা হবে ! মিছরিও মাথা নাড়ল পরে জেনেছিল, হস্টেলে ঝামেলা হয়েছেওইদিক থেকে হুমকি এসেছে মিছরি কিছু বুঝতে পারেনি । রুমি এত ভাল ছেলে, ওর শত্রু থাকতে পারে পরে বুঝেছে, ধর্ম রুমিকে শত্রু বানিয়েছে আসলে ধর্ম না, ওরা রুমিকে রুমির মত অনেককেই শত্রু প্রমাণ করতে চাইছে মিছরি কখনও ভাবনি আর কোনওদিনও রুমিকে দেখতে পাব না দুইদির রুমির ফোন বন্ধ । বাড়িও ফেরেনি । হারিয়ে গিয়েছে রুমি । যোগাযোগ করা যাচ্ছে না । ওরা প্রতিবাদ করেছিল । সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করেছিল । মিছিলে হেঁটেছিল । 12 দিন অনশনের পর অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে ভরতি হয়েছিল । বাড়ি ফেরার পর দেখল সব পাল্টে গিয়েছে । ওরা কেসটাকে পুরো অন্যভাবে সাজিয়েছে । রুমির মা থানায় অভিযোগ করতে গেলে ওকে মারধর করে বাড়ি পাঠানো হয়েছে এফআইআর দায়ের হয়নি । এই ঘটনার কোনও মিডিয়া কভারেজ হয়নি উল্টে প্রশাসন দাবি করেছে, রুমি সমাজবিরোধী কাজে যুক্ত তাই গা ঢাকা দিয়েছে কাল নেহা বলেছিল, একদিন রুমি ঠিক ফিরবে দেখিস

নিস্তব্ধতা ভাঙল সৌভিক । বলল, তোর সঙ্গে কথা বলতে খুব ভাল লাগে সুপর্ণা ৷ রাতে তোর মেসেজের অপেক্ষা করি যেবার সেই ওরিয়েনটেশনে দেখা হল, তখন ভাবিনি যে আবার তোর সঙ্গে দেখা হবে তোকে খুব ভাল লেগেছিল কিন্তু মনে হত, তুই সেই স্বপ্নটা যাকে ছোঁয়া যায় না শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা আসার পর তুইই প্রথম মানুষটা যাকে সবচেয়ে ভাল লেগেছিল আবার চলে যাবি মিছরি?
---  তুই আমার ডাকনাম কীভাবে জানলি?
---  আমি জানি বল না, পাশে থাকবি আমার ? আমি জানি তুই আমার জন্য শহরে এসেছিস কিন্ত আমি অন্য একটা কারণে শহরে এসেছি তোদের সাহায্য প্রয়োজন থাকবি আমার পাশে?
---  কী কারণ? কী সাহায্য শুনি সেরকম হলে নিশ্চয়ই থাকব
---  তোদের য়ুনিভার্সিটির ছেলেটা রুমি, জানিস নিশ্চয়ই তোরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছিস সবাই জানত, তুই রুমি আরও অনেকেই খুব ভাল বন্ধু ছিলি মানুষের পাশে থাকার জন্য রুমি সেসময় বারবার খবরে আসছিল মাঝেমধ্যে তুইও আসছিলি তোর মনে আছ তো রুমির কথা

মিছরি অবাক হয়ে সৌভিকের দিকে তাকাল রুমিকে ভুলে যাবে ও? ওর জীবন ছিল রুমি কীভাবে ভুলে যাবে !  সৌভিক আবার বলল, "রুমির হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক বিদ্বেষ,  ওর মায়ের উপর পুলিশের অত্যাচার এসব আমরা জানি মিডিয়ার মিথ্যে প্রচার আমরা ভুলে যাইনি এই শহর রুমিকে ভুলে যায়নি আমরা জানি ও কোনও সমাজবিরোধী কাজে যুক্ত থাকতে পারে না আর রুমিরা হারিয়ে যায় না ঠিক ফিরে আসে যা মানুষের সামনে আসেনি, আমি সেই ছবিই মানুষের সামনে নিয়ে আসতে চাই সুপর্ণা আমি এই পুরো ঘটনাটার উপর একটা ডকুমেন্টরি ফিল্ম করতে চাই রুমির মা, তোদের সবার ইন্টারভিউ আমার প্রয়োজন"
মিছরি চুপ করে আছেসৌভিক আবার প্রশ্ন করল, "বল না পারব না আমি? থাকবি না তুই পাশে? "   মিছরি চুপ করে থাকল ও কোনওদিন ভাবেনি, রুমির কথা আবার শহর মনে করবে কখনও ভাবেনি, মানুষের সামনে সত্যি আবার আসতে পারে সৌভিক ঠিক বলেছে,  রুমিরা কখনও হারিয়ে যায় না ওরা ফিরে আসবেই
--- আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে আসছে সৌভিকবের হই না কি?
--- চলে যাবি? থেকে যা না!
--- বললাম না,  এই শহরে বেশিদিন আমি থাকতে পারি না আমার দমবন্ধ লাগে তুই ছবির কাজ কবে থেকে শুরু করবি ?
--- পরের মাস থেকে এই মাসে প্রি-প্রোডাকশনের কিছু কাজ রয়েছে ফান্ড জোগাড় করা, স্ক্রিপ্ট লেখা ইত্যাদি কাজগুলো সেরে ফেলতে হবে তুই পাশে না থাকলে এই ছবিটা করার ভরসা পাচ্ছি না রে!
---  ফান্ডিং-র ব্যাপারটা তুই দেখ, আমিও দেখছি বের হই রে দেরি হয়ে যাচ্ছে

দুইজন ব্রডওয়ে থেকে বের হল ক্যাব বুক করল মিছরি "আমি যাই সঙ্গে? ", জিজ্ঞেস করল সৌভিক   মিছরি মাথা নেড়ে না জানাল ক্যাব এসে গেল মিছরি উঠে পড়ল ক্যাবে হাত নেড়ে সৌভিককে বাই জানাল "ফোন করিস পৌঁছে আর শোন, আগের থেকে অনেক বেশি সুন্দর হয়েছিস! মিস করব! দেখা হবে!" গাড়ির কাচ উঠিয়ে দিল মিছরি । 
কদিনের জন্য শহরে আসা হোয়াটসঅ্যাপ খুলে নেহাকে মেসেজে লিখল, 'যাই রেদেখা হবে আবার '  রুমি বলত, তুই আমায় ছেড়ে যেতেই পারিস আমি তোকে ছেড়ে যাব না তুই বিদেশে পড়তে যা, শহরে ফিরলে তোকে আমাতেই  ফিরতে হবে সেই বছর এমএ শেষ করার পর বিদেশে পিএইচডি করার সুযোগটা ছেড়ে দিয়েছিল মিছরি মনে হয়েছিল, আর এইসব চায় না জীবন, পৃথিবী, স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে মিথ্যে হয়ে গিয়েছিল রুমির স্বপ্ন, ওর স্বপ্ন, ওদের সবার স্বপ্ন ছিল প্রত্যেকটা মানুষ ভালভাবে বাঁচুক, সমান অধিকারে বাঁচুক ওদের সেই স্বপ্ন সময়ের সঙ্গেই হারিয়ে গেছে এখন তো নিঃশ্বাস নিতেও ভয় হয় কিন্তু এই ভয় নিয়ে কতদিন আর বেঁচে থাকা যায়? মুখ খুললে জীবন যেতে পারে, যাবে !  রুমি ফিরে আসবে না, কিন্তু অন্যান্য রুমিরা সাহসের সঙ্গে বেঁচে থাকবে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে সৌভিককে মেসেজে লিখল, "থ্যাংক ইউ! আমি সবরকমভাবে তোর পাশে আছিরুমির জন্য আমরা লড়বআমি পালাব না পরের মাসে আসছি । ইন্টারভিউ দেব ।" উত্তর এল, "জানি" ক্যাব থেকে নেমে এয়ারপোর্টে ডমেস্টিক এন্ট্রান্সের দিকে এগিয়ে গেল মিছরি হঠাৎ মনে হল কেউ ডাকছে পিছনে ঘুরে তাকাল, রুমি দাঁড়িয়ে! সেইদিন অটোয় ওঠার সময় যে পাঞ্জাবিটা পরে ছিল, সেই পাঞ্জাবিটাই পরে রয়েছে হাত নেড়ে বলল, আবার দেখা হবে...     




                                        
                                  

                             
 

Monday, 16 March 2020

সব মনে রাখা হবে --- (অনুবাদ)

দীর্ঘদিনের অসুখ বয়ে বেড়াচ্ছি। এমনিই যাদের শ্বাসযন্ত্র প্রায় বিকল, তাদের নতুন করে মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রায়ই ডাক্তারবাবু বলেন হাসপাতালে ভরতি হয়ে যাও। আমিও জানাই সম্ভব না। এমন মানুষও নেই, যে ঘাড় ধরে রীতিমত নিয়মে বাঁধবে। একার জীবনে আমিও সেই স্বাধীনটি হতে চেয়েছিলাম, যে তারে বসা পাখি কিংবা মধ্যরাতের নিঃশব্দের কোলাহলে হেঁটে যাওয়া মত্তের মত স্বাধীন। অসুখের এই দুদিনে দশটা করে ট্যাবলেট ঘণ্টায় ঘণ্টায় খেতে খেতে নিজেরও ক্লান্ত লাগে। একার অসুখে তখন কবিতাই বন্ধু। আমি কবিতা পড়তে ভালবাসি, লেখার চেষ্টা করি একটু আধটু কিন্তু আগে কখনও অনুবাদ করিনি। এই প্রথম কবিতা অনুবাদ করলাম। আমির আজিজের লেখা 'সব ইয়াদ রাখা যায়েগা' কবিতাটি কাল অসুস্থ শরীর নিয়ে সকালে বসে অনুবাদ করেছি। দেশে এমন এক পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে যে নতুন করে দমবন্ধ অনুভব হয় না। দিল্লি দাঙ্গার সময় একাধিক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। হিংসার আঁচ এসে ছুঁয়েছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আঘাত এসেছে। আগুন জ্বলেছে ক্যাম্পাসে। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও পুলিশ ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের উপড়ে ফেলতে চেয়েছিল। আমরা জামিয়া, জেএনইউ, এইচইউ, এএমইউ-র কথা জানি। সেই আঘাত, সেই ক্ষত নতুন নয়। রক্তপাত হয়। আমরাও সেই রক্ত মুছে নিয়ে উঠে দাঁড়াই। এক অসম যুদ্ধের ঘোষণা করি। রাষ্ট্রের বন্দুক বনাম আমরা, অন্যায় বনাম আমরা। যে যুদ্ধে ইতিমধ্যেই আমরা সবাই লড়াইরত, তার শেষ কোথায় জানি না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে যেতে জানি না। অনুবাদটি রাখলাম, যাতে এই লড়াইয়ের ইতিহাসে এক অংশ হয়ে থাকে।                     



সব মনে রাখা হবে

তুমি রাতের আকাশ এঁকো, আমরা চাঁদের স্বপ্ন দেখব
তুমি জেলে ভরো, আমরা প্রাকার ভেঙে লিখব।
তুমি এফআইআর দায়ের কোরো, আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলব।
তুমি বিপ্লবের হত্যা করতে চাও, করো । প্রেত হয়ে ফিরব। 
সেইসব মৃত্যুদের শব্দে লিখব। 

তুমি আদালতে বসে মজার কথা লিখো
তুমি আদালতে বসে মজার কথা লিখো,
রাস্তায়, দেওয়ালে 'বিচার চাই' লেখা থাকবে।
আমাদের কথা এতই উদ্ধত, বধিরও শুনতে পাবে।
আমাদের লেখা এতই স্পষ্ট, দৃষ্টিহীন পড়তে পাবে। 
তোমাদের বুলেট আসবে, আমরা ফেরাব লাল গোলাপ।
পৃথিবী তোমার অন্যায়ের আঁতুড়ঘর
কিন্তু মহাকাশে বিপ্লবই দীর্ঘজীবী হবে।
সব মনে রাখা হবে।
সব কিছু মনে রাখা হবে। 


তোমাদের লাঠি, তোমাদের বুলেট
যে সাহসী বন্ধুদের প্রাণ কেড়েছে
তোমাদের লাঠি, তোমাদেরই বুলেট যে সাহসী বন্ধুদের প্রাণ কেড়েছে
তাঁদের স্মৃতির নাম যন্ত্রণা রাখা হবে।
সব মনে রাখা হবে, সবকিছু মনে রাখা হবে। 



তোমাদের মিথ্যেই অস্ত্র, আমরা জানি
তোমাদের মিথ্যেই অস্ত্র, আমরা জানি।
দোয়াতে ভরা নিজের রক্তে মাতৃভূমিতে সত্যের কথা লেখা হবে। 
সব মনে রাখা হবে।
সব কিছু মনে রাখা হবে।


মোবাইল, ইন্টারনেট, টেলিফোন প্রকাশ্যে বন্ধ করে
শীতের রাতে পুরো শহরকে বন্দী করে
অস্ত্র হাতে জবরদস্তি আমার ঘরে ঢুকে
আমার ছোট্ট জীবনকে তছনছ করা। 
আমার সন্তান, আমার প্রাণের টুকরো
আমার সন্তানকে মাঝরাস্তায় হত্যা করার পর তোমার অহংকারের হাসি
মনে রাখা হবে।
সব কিছু মনে রাখা হবে। 


দিনের আলোয় দেশের সামনে তোমার মিষ্টি কথা, "সব ঠিক আছে! "
রাত হতেই অধিকারের লড়াইরত মানুষের উপর শাসকের লাঠি-গুলি
আমাদের অত্যাচার করে, আমাদেরই অত্যাচারী তকমা
মনে রাখা হবে। সব কিছু মনে রাখা হবে। 

তোমার নিষ্ঠুর হারের কথা, যাকে তুমি জিত মনে করো
তোমার নিষ্ঠুর হারের কথা আমায় আমার হাড়ে লিখতে দাও।
আমার থেকে তুমি আমার অস্তিত্বের কাগজ দেখতে চাও।
অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়া হবে।
তোমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত   এ যুদ্ধ লড়া হবে।
সব মনে রাখা হবে।
সব কিছু মনে রাখা হবে।


মনে রাখা হবে, কীভাবে তোমরা মাতৃভূমিকে ভাঙতে চেয়েছিলে
এও মনে রাখা হবে হাজার সংগ্রাম লড়ে আমরা হেঁটেছি ঐক্য মিছিলে
পৃথিবীতে যখনই কাপুরুষের সমালোচনা হবে
তোমার কথাই প্রথম মনে করা হবে।
সব মনে রাখা হবে। সবকিছু মনে রাখা হবে।। 

এবং পৃথিবীতে সাহসী প্রাণের উদাহরণে আমাদের নাম মনে রাখা হবে।
যে... কয়েকজন মানুষ ছিল, যাঁদের নীতি অস্ত্রের আঘাতে ভেঙে যায়নি।
যাদের স্বাধীন স্বপ্ন মোটা টাকায় বিকিয়ে যায়নি, যেমন তোমাদের গেছে।
প্রচণ্ড ঝড়ের পরেও যারা ঠায় দাঁড়িয়েছিল।
কয়েকজন তাদের মৃত্যুসংবাদের পরও জীবিত ছিল।     
  

চোখে ভুলে যাক ঘুমের স্মৃতি, পৃথিবী তার কক্ষপথের ঠিকানা ভুলে যাক।
কিন্তু আমাদের ভাঙা ডানার ঝটপটানির শব্দ
আমাদের বন্দীকন্ঠের স্লোগান মনে রাখা হবে। সবকিছু মনে রাখা হবে।
      
তুমি রাতের আকাশ এঁকো, আমরা চাঁদের স্বপ্ন দেখব
তুমি জেলে ভরো, আমরা প্রাকার ভেঙে লিখব।
তুমি এফআইআর দায়ের কোরো, আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলব।
তুমি বিপ্লবের হত্যা করতে চাও, করো । প্রেত হয়ে ফিরব। 
সেইসব মৃত্যুদের শব্দে লিখব। 

তুমি আদালতে বসে মজার কথা লিখো
তুমি আদালতে বসে মজার কথা লিখো,
রাস্তায়, দেওয়ালে 'বিচার চাই' লেখা থাকবে।
আমাদের কথা এতই উদ্ধত, বধিরও শুনতে পাবে।
আমাদের লেখা এতই স্পষ্ট, দৃষ্টিহীন পড়তে পাবে। 
তোমাদের বুলেট আসবে, আমরা ফেরাব লাল গোলাপ।
পৃথিবী তোমার অন্যায়ের আঁতুড়ঘর
কিন্তু মহাকাশে বিপ্লবই দীর্ঘজীবী হবে।
সব মনে রাখা হবে।
সব কিছু মনে রাখা হবে। 


যাতে পৃথিবীর অভিশাপ হয়ে থাকে তোমাদের নাম
কালিমালিপ্ত হয় তোমাদের অহংকারের হাসি
তোমাদের অন্যায় ও অত্যাচার মনে রাখা হবে।
সব মনে রাখা হবে। সব কিছু মনে রাখা হবে।

 মূল কবিতা : সব ইয়াদ রাখা যায়েগা - আমির আজিজ

Friday, 12 July 2019

পিতৃতান্ত্রিক এবং শ্রেনী শোষণের একটি রাষ্ট্রকাহিনী: আর্টিকেল ১৫

সমাজে বা অন্যান্য যে কোনো গঠন ব্যবস্থায় দু'টি শ্রেণীই হয় এক শাসক শ্রেণী বা শোষক শ্রেনী, দুই হল যারা শাসিত ও শোষিত হয়। একটি সম্পর্ক, একটি পরিবার ব্যবস্থা তথাপি একটি সমাজ ব্যবস্থায় এই দুই শ্রেনীই বিশেষ ভাবে পরিলক্ষিত হয়। আপাতত যে বিষয়টি আলোচ্য, তা হল এই প্রত্যেক শ্রেণীশোষণ। হিন্দু সমাজের পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ সমাজের কদর্য্য ইতিহাসের রূপ সবার জানা। সবার জানা, জাতিবিভেদ ও বর্ণ বিভেদ সৃষ্টির কথা।
আমাদের এও জানা, স্বল্প বয়সী বিধবা মেয়েদের ব্রাহ্মণ সমাজের তার ভোগ বস্তুতে রূপান্তরিত করার কথা। দিনের আলোর প্রকাশ্যে যে মহিলাকে সমাজের এক ঘরে করে দেওয়া হয়, রাতের অন্ধকার তার ঘরে পুরুষাঙ্গের জবরদস্তি প্রবেশ ঘটিয়ে তাঁকে তাঁর শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে চেষ্টা করে। আমরা শ্রেনীশোষণ, জমিদার বা সামন্ততান্ত্রিক প্রথার কথা পড়েছি। কর আদায়ের প্রেক্ষিতে বেতাঘাত, অত্যাচারের কথা পড়েছি। এবং এই বিষয় স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত যে, একদল জবরদস্তি শাসন করে আর একদল শোষিত হয়। আমরা ভাবি এই জাতিভেদ প্রথা এই অত্যাচারের সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু কই? আমার পারিপার্শ্বিক গণ্ডিটাই একটা ভারতবর্ষ নয় যে! উত্তরপ্রদেশের এক হিন্দুত্ববাদী প্রত্যন্ত গ্রামও সেই ভারতবর্ষের অংশ, যেখানে শ্রেণী শোষণ একইভাবে আজও প্রাসঙ্গিক। মার্ক্সবাদ শ্রেনীশোষণকেই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি বলে চিহ্নিত করে, মার্ক্সবাদী ফেমিনিস্টরা লিঙ্গভিত্তিক শোষণের চেয়ে শ্রেণী শোষণকেই বেশি গুরুত্ব দেন, মার্ক্সবাদকে সমালোচনা  করে হার্টম্যান তাঁর 'The Unhappy Marriage of  Marxism and Feminism' প্রবন্ধে   উল্লেখ করেন পুঁজিবাদের চেয়েও পিতৃতান্ত্রিক শোষণ অনেকবেশি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কারণ কালের দিক থেকে তা অনেক বেশি পুরাতন।  পরবর্তীকালে নিউ লেফট, ইয়াং মার্ক্স, সম্পর্কিত মার্ক্সীয় আলোচনা, গ্রামসির চিন্তার নবমূল্যায়ন, ইত্যাদি মতাদর্শ ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্ব দেয়। শ্রেনীশোষণের বাইরেও পিতৃতান্ত্রিকতার একটা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে তা হার্টম্যানের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উৎপাদনক্ষম শ্রম, উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাইরেও পরিবার ও প্রজননক্ষেত্রেও পিতৃতান্ত্রিক মূল থাকতে পারে। অঅর্থাৎ, শ্রেণী শোষণের উর্দ্ধেও পিতৃতান্ত্রিক লিঙ্গভিত্তিক শোষণের অবশ্যই একটি অস্তিত্ব রয়েছে। আলোচ্য এই যে, একটি গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় জাতিভেদে, বর্ণভেদে যে শ্রমবিভাজন ও শ্রেণীবিভাজনের প্রেক্ষিতে যে শ্রেণীশোষণ প্রচলিত সেই শোষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘৃণ্য জায়গায় থাকছে 'লিঙ্গভিত্তিক পিতৃতান্ত্রিক শোষণ'! পৌরুষ ও নারীত্ব কী? আর্টিকেল ১৫ নিয়ে আলোচনা করার আগে সদ্য আলোচিত আর একটি ছবি 'কবীর সিংহ' নিয়ে দুই একটি লাইন লিখব। নারীবাদী প্রাস্কপেক্টিভ থেকে দেখার পর ছবিটি তীব্র সমালোচিত হয় এবং তাকে মিসোজিনিস্ট ছবি বলা হয়। শুধুমাত্র কবীর সিংহ কেন বলিউডের বেশিরভাগ মূলধারার ছবিরই দৃশ্যপরিকাঠামো অবশ্যই পিতৃতান্ত্রিক ও একটি পুরুষ দৃষ্টিকে সুখপ্রদান করতে তৈরি হয়, যেখানে দেখার বিষয়ী সব সময়েই নারী ও দৃষ্টিবাহক পুরুষ। এই নিয়ে ফেমিনিস্ট ফিল্ম থিয়োরিতে একাধিক প্রবন্ধের উল্লেখ করা যায়। এতদূর না ভেবেও, কবীর সিংহ-এর সমালোচনায় অনেককে রুখে দাঁড়িয়ে ফেমিনিস্টরা বাড়াবাড়ি করছে যাবতীয় কথা বলতে শোনা যাচ্ছে, 'রানঝনা'-এর সময়ে এইসব ফেমিনিস্টরা কোথায় ছিল জাতীয় কথা উঠে আসছে। একটি মেয়ে(সে প্রেমিকা বা বিলাভেড) যখন ছেলেটিকে (প্রেমিক)-কে চড় মারছে সেটি অন্যায় নয় আর ছেলেটি করলেই অন্যায়, এ ফেমিনিস্টদের কেমন বিচার? উল্লেখ করি, সম্পর্কে ফিসিকাল ও মেন্টাল অ্যাবিউস কোনোটাই গ্রহণযোগ্য ও ক্ষমা যোগ্য নয়, সে যে পক্ষই করুক। এখন এই বিষয়টি আরো একবার মনে করা দরকার, একজন পুরুষ তার স্ত্রী বা প্রেমিকাকে থাপ্পড় মারেন বা শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করেন শুধুমাত্র তার মেল সুপ্রিমেসি দেখানোর জন্য, স্ত্রীকে দমিয়ে রাখার জন্য যা একটি শোষণ, লিঙ্গভিত্তিক শোষণ। একইভাবে, যদি তা অপরপক্ষও করে।  এই দুই উদাহরণের কোনো তুলনা চলেনা। ফিল্মের ক্ষেত্রে যেখানে গোটা দৃশ্য পরিকাঠামোই যখন পিতৃতান্ত্রিক সেক্ষেত্রে একটি দুটি দৃশ্য এক্সেপশন হয় উদাহরণ হয়না। 'Women's Cinema as Counter Cinema'- এ ক্লেয়ার জন্সটন উল্লেখ করছেন চলচ্চিত্র একটি সেক্সিস্ট ইডিওলজিকে মেনে চলে তাই তার বিরোধিতা করতে গেলে সেই সিস্টেমের মধ্যে থেকেই সিস্টেমের বিরূদ্ধে ছবি বানাতে হবে। যেমন, শ্রেণিশোষণে মুক্তির পথ সংগ্রাম ও অস্ত্র বলে ভাবা হয়।

শ্রেণীশোষণ ও লিঙ্গভিত্তিক শোষণ নিয়ে আলোচনা করার কারণ, 'আর্টিকেল ১৫' ছবিটি নিয়ে আলোচনা করব তাই। ছবিটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে এবং ছবিটির সত্য ঘটনাটি অর্থাৎ ছবির গল্প সবার জানা, তাও একবার আলোচনা করে নিই। উত্তরপ্রদেশের একটি গ্রামে দুজন বোন দিন প্রতি ২৫টাকার বিনিময়ে শ্রমিকের কাজ করত, তারা জাতিতে নিম্নবর্ণীয় ছিল। উত্তরপ্রদেশের সেই গ্রামে উচ্চবর্ণীয়রা নিম্ন বর্ণীয়কে ক্রীতদাস হিসেবে দেখে এবং তাদের ছোঁয়াও খায়না। তারা দিন প্রতি ৩টাকা মজুরি বানানোর দাবিতে তাদের মালিক তাদের মারধোর করে এবং মেয়ে তিনটি ও অন্যান্য কিছুজন সেই কাজ ছেড়ে কাছেই একটি জুট মিলে কাজ শুরু করে। এরপর মেয়ে তিনজন(একজন মারা যায়নি) নিঁখোজ হওয়ার পরেও তাদের বাড়ির অভিযোগ লোকাল থানা নথিভুক্ত করেনি, তার দুদিন পর তাদের দুজনের মৃতদেহ গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।



 প্রাথমিক ময়নাতদন্ত প্রমাণ করে যে এটি গ্যাং রেপ ও মার্ডার কিন্তু সিবিআই সেসব ভুল প্রমাণ করে আবার অক্টোবর মাস ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেটিকে মিথ্যে হিসেবে খারিজ করে ও অভিযুক্তদের শাস্তি দেয়। এই আলোচ্য ঘটনাটি ২০১৪ সালে ঘটে।
এই প্রেক্ষাপটেই 'আর্টিকেল ১৫' এর স্টোরিলাইন। আয়ন রঞ্জন আইপিএস অফিসার ইনচার্জ হয়ে থানায় আসার পর পরই এই ঘটনাটি ঘটে। সম্পূর্ণ  ছবিতে একটি কালার টোন ব্যবহৃত হয়েছে, শীতের সকালে যখন গ্রামবাসীরা দুইজন মেয়ের মৃতদেহ খুঁজে পায় সেই দৃশ্যটিতে ব্যবহৃত কালার টোন নীলচে অর্থাৎ 'ওয়ার্মথ' নয়।





 একটি শীতের ভোরবেলা সম্পূর্ণ দৃশ্যজুড়ে শীতলতা নিয়ে আসে, একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রনা অনুভব হয়। সংলাপের দ্বারা অভিব্যক্তি প্রকাশ না করেও শুধুমাত্র আলোর ব্যবহার ও কালার টোন এবং ছবির ডিটেইলিং সেই দৃশ্যের সেই মুহূর্তের যন্ত্রণার তীক্ষ্ণতা অনুভব করায়।



 একাধিক দৃশ্য বারবার মনে করিয়ে দেয় ২০১৯ এর প্রেক্ষাপটের ভারতবর্ষ বর্ণবিভেদে এক শ্রেণীশোষণ জারি রাখে।  একই মন্দিরে ভাত খাওয়ার জন্য নিম্নবর্ণীয়দের বেত্রাঘাত করা হয়। সাম্প্রতিক হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছবিটির জাতিগত বর্ণগত রাজনীতি, পিতৃতান্ত্রিক জেন্ডার  রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছবিটিতে দৃশ্যায়িত একটি মন্তাজে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক নেতার সভা, ভারতের জয়জয়কার একইসাথে নিম্নবর্ণীয়দের অত্যাচারিত হওয়ার দৃশ্য তার সভায় আগুন লেগে যাওয়ার দৃশ্য একইসাথে ক্রসকাটিং- দেখানো হয়।



 এইরূপ দৃশ্যগঠন প্রশংসনীয় একইসাথে অস্বস্তিকরও। সর্বশেষে আলোচনা করি, বলিউডের মেন্সট্রিম ছবি যখন কেবলমাত্র একটি পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টি পরিকাঠামোকে তোষামোদ করে, পুরুষ দৃষ্টি ও পুরুষ যৌনতাকে সুখপ্রদান করতে চায় সেই একই সময়ে দাঁড়িয়ে বলিউড মেন্সট্রিম রাষ্ট্রের সংবিধানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক ফান্ডামেন্টাল রাইটকে গুরুত্ব দেয়।  জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সেক্স, জন্মস্থান নির্বিশেষে রাষ্ট্র কারোর প্রতি কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করবেনা, এবং প্রত্যেকের অধিকার সমান। অর্থাৎ সাম্যতা এবং রাইট টু ইকুয়ালিটির একটি। আইপিএস    আয়ন রঞ্জন আর্টিকেল ১৫ এর একটি প্রিন্টেড কপি যখন থানার নোটিশ বোর্ডে এনে লাগায় এবং আবহে 'বন্দেমাতারম' গানটি শোনা যায়, চোখে জল আসে গায়ে কাঁটা দেয়! এই মাতৃভূমির কথাই তো ভেবেছি এই মাতৃভূমিকে বন্দনা করেছি আমরা। আয়ন রঞ্জন তার প্রেমিকার সাথে ফোনের কথোপকথনের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে, তথাকথিত নায়ক নায়িকার সম্পর্কের সংজ্ঞা পেরিয়ে আর্টিকেল ১৫ -এ একটি সাম্যতার  সম্পর্ক তৈরি হয়। আয়নের গার্লফ্রেন্ড অদিতিকে যে পেশায় একজন লেখিকা ( জেন্ডার পলিটিক্স, উওমেন রাইটস নিয়ে লেখালেখি করে) ফোনে যখন আয়ন  বলে, তোমার একজন হিরো চাই, উত্তরে অদিতি জানায়, আমার হিরো নয় এমন মানুষদের চাই যাদের একজন হিরোর প্রয়োজন নেই।

   এছাড়াও ছবিটি নিম্নবর্ণীয়দের অধিকারের জন্য লড়াই করা অ্যাক্টিভিস্টদের উপরেও দৃষ্টিপাত করে।
আর্টিকেল ১৫ মনে করিয়ে দেয়, একটি ঘৃণ্য পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কথা। যেখানে শ্রেণী শোষণের উর্দ্ধে   পিতৃতান্ত্রিক শোষণ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। নিম্নবর্ণীয় হওয়ার ভিত্তিতে মালিক শ্রেণি শ্রমিক শ্রেণির মজুরি বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিক শ্রেণিকে অত্যাচার করতে পারে, কিন্তু তা যদি দুটি মেয়ে হয় তবে তার উপর অত্যাচারের মাপকাঠিটা দ্বিগুণ হয়। ধর্ষণের  মত পিতৃতান্ত্রিক হাতিয়ারকে ব্যবহার করে তাদের গোটা গ্রামের সামনে গাছ থেকে জীবন্ত ঝুলিয়ে দেওয়া যায় শুধুমাত্র তাদের 'অওকাত' বোঝানোর জন্য। যাতে তারা একটা উদাহরণ হয়ে থাকে গোটা সমাজের কাছে, যারা অন্তত নিজেদের অধিকারের জন্য সামান্য কথা বলেছিল। নিজের ফান্ডামেন্টাল রাইটের প্রেক্ষিতে ভিত্তিতে বলেছিল।


কন্টেম্পরারি পলিটিকাল অ্যাজেন্ডা, শ্রেণী শোষণ ও পিতৃতান্ত্রিক শোষণ রাষ্ট্রের প্রতিটা কোষে কোষে রয়েছে আদিমযুগ থেকে। জাতি ধর্ম বিশেষে তা অন্য রূপ ধারণ করেছে কেবল।