HAPPY READING...


Showing posts with label বিশ্বভারতী বাঁচাও. Show all posts
Showing posts with label বিশ্বভারতী বাঁচাও. Show all posts

Wednesday, 19 August 2020

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রতই না হয়, সেই শিক্ষাই অসম্পূর্ণ

এই সময় বিশ্বভারতীকে বাঁচানোর, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বাঁচানোর 

শাসকপক্ষ বারবার বলে, শিক্ষাক্ষেত্র রাজনীতির পরিসর নয় । তবে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার জাগরণ কোথায় হবে ?  একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রমনের যদি রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রতই না হয়, তবে সেই শিক্ষাই অসম্পূর্ণ । বিশ্বে অরাজনৈতিক কোনও ধারনার অস্তিত্ব নেই । একটি ছাত্রমনই প্রশ্ন করবে, অধিকারের জন্য লড়বে । নিজের মৌলিক অধিকার ও দায়িত্ব বুঝে আরও চার-পাঁচজনের কথা ভাববে । দারিদ্র, অন্যায়, অনাহার যদি তাকে না ভাবায় তাহলে সে কি আদৌতে শিক্ষার আলোকে আলোকিত হয়েছে ?  কিন্তু ফ্যাসিবাদী সরকার কখনওই চাইবে না, তাদের কাজের বিরুদ্ধে কেউ প্রশ্ন করুক । তারা কখনওই চাইবে না, শিক্ষার্থীরা মৌলিক অধিকার বুঝে নিক । মানুষের কথা ভাবুক, মানুষের জন্য লড়ুক । বিজেপি সরকারের যে কোনও সিদ্ধান্তের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত সরব হয়েছে । সবথেকে বেশি সরব হতে দেখা গিয়েছে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেই । নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ হওয়ার পর জামিয়া, জেএনইউ, যাদবপুর, হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছেন । আওয়াজ তুলেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে । এসেছে কবিতা, গান, স্লোগান । শাসকগোষ্ঠী ফিরিয়ে দিয়েছে বুলেট, লাঠি ও অত্যাচার । কিন্তু সেই আন্দোলন থেমে যায়নি । একইভাবে শাহিনবাগ আন্দোলনে ও দিল্লি দাঙ্গার সময়েও ছাত্র-ছাত্রীদের সরব হতে দেখা গিয়েছে । দেখা গিয়েছে দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রতিবাদের সুর সবথেকে জোরালো । কারণ, শিক্ষার আলো সেইসব ছাত্রমনকে ছুঁয়েছে । মানুষের কথা ভাবতে শিখিয়েছে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখিয়েছে । রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন করার স্পর্ধা দিয়েছে । এই স্পর্ধা জন্ম জন্মান্তরের, প্রকৃত শিক্ষা সঠিক রাস্তা চিনিয়ে দেয় কেবল...                                    

                        


 শিক্ষাক্ষেত্রের উপরেই বারবার আঘাত কেন ? যাদবপুর, জেএনইউ এখন বিশ্বভারতী ! বারবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আঘাত কেন ?  গতবছর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে যেইদিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চার নম্বর গেটে আটকানো হয়, গায়ের জোর দেখিয়ে তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন । তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা ছাত্রীদের গায়ে হাত তোলে । রাতে এবিভিপির গুণ্ডারা এসে ক্যাম্পাসে আগুন লাগায়, ভাঙচুর চালায় । চার নম্বর গেটের বাইরে দোকান ভেঙে দেয় । বন্দুক নিয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায় । পুলিশ ছাত্রীদের অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করে, গায়ে হাত তোলে ! যদিও সংবাদমাধ্যমগুলি নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশ করেনি । এক পাক্ষিক একটি সংবাদ পরিবেশন করেছিল কেবল । মুষ্টিমেয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যম বাদ দিয়ে বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমগুলি ইতিমধ্যেই শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে । সেই দেশে গণতন্ত্রের কথা চিন্তাও করি কীভাবে আমরা ?  বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুর ও শিক্ষার্থীদের উপর এবিভিপির অকথ্য অত্যাচারের কথা মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলিতে প্রকাশ্যে আসেনি । 

 


চলতি বছরে 5 জানুয়ারি একইভাবে জেএনইউ ক্যাম্পাসে ঢুকে ঐশীকে মারে এবিভিপির গুণ্ডারা । অন্যান্য পড়ুয়া ও অধ্যাপকদেরও মারধর করা হয় । ক্যাম্পাসে ভাঙচুর চলে । জামিয়ার মিছিলে ছাত্রকে গুলি করে এক দুষ্কৃতী । সেইসময়ও পুলিশ ঘটনাস্থানে ছিল ও দাঁড়িয়ে দেখছিল । আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দিল্লির পুলিশ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে ।

 

                       

 

প্রত্যেকটা ঘটনা থেকে এই বিষয় পরিষ্কার যে, বারবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকেই লক্ষ্য করেছে দক্ষিণপন্থীরা । রাষ্ট্র ছাত্র-ছাত্রীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ করেছে বারবার । কিন্তু কেন ? আমরা ভেবে দেখেছি ?

 

প্যানডেমিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সিবিএসই-র পাঠ্যক্রম থেকে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মতো বিষয়কে বাদ দিয়েছে কেন্দ্র । নতুন শিক্ষানীতি আরোপ করেছে । পুরাতন শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে দিতে চেয়েছে । দেশে এক নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চেয়েছে , কেন?  কারণ আমরা ভেবে দেখিনি । তবে যদি এখনও ভেবে না দেখি, তবে আর কবে ভাবব ? কারণ এইবার আঘাত এসেছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ।  সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন চলছিলই, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরকে নিয়ন্ত্রণাধীন করতে চাইছে বিজেপি সরকার । আমরা রবীন্দ্রনাথের ভাবধারায় নিজেদের ভাসিয়ে দিতে পারিনি বলেই জ্ঞানের সেই আলোক আমাদের এখনও ছুঁয়ে যেতে পারেনি । পূজা পর্যায়-প্রেম পর্যায়ের মধ্যবর্তী বিভাজন রেখা আমাদের মনে বিলীন হয়ে যায়নি । প্রেমে ঈশ্বরকে খুঁজে পেতে পারিনি তাই ! সাধারণত হিন্দুত্ববাদীরা পশ্চিমী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিরোধী হয় । কিন্তু রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন গড়ে তোলা, ছাত্র-ছাত্রীদের মুক্ত পরিসরে শিক্ষা দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল বিদেশের ও দেশের শিক্ষার এক মিলন । খোলা আকাশের নিচে বদ্ধ পরিসরের বাইরে অধ্যাবসায়ের লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল শান্তিনিকেতনের পথ চলা । আমরা বাংলা সাহিত্যে এমনকী বিদেশী সাহিত্যেও তার উল্লেখ পেয়েছি । রবি ঠাকুরের লেখায় তার উল্লেখ পেয়েছি । সেই শান্তিনিকেতন সেই বিশ্বভারতীকে অধীনস্থ করার চেষ্টা চলছে । পৌষমেলার মাঠে পাঁচিল দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছে । ছাত্র-ছাত্রীরা বারবার তার বিরোধিতা করেছেন । আওয়াজ তুলেছেন, শান্তিনিকেতন বাঁচাও । এখন সত্যিই আমাদের শান্তিনিকেতন বাঁচানোর সময় ! শান্তিনিকেতনের কোনও বাঁধা পরিসর নেই, থাকতে পারে না । শাসকগোষ্ঠী বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি , বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকার আছে পাঁচিল দেওয়ার ! রাজ্যপাল রবি ঠাকুরের উপমা টানছেন । রবি ঠাকুরের স্বপ্নকে আঘাত করে তাঁর কথাই উল্লেখ করার স্পর্ধা কীভাবে হয় এঁদের আমি জানি না । 

 

                 

স্থানীয় লোকজন ও রাজ্যের শাসকদলের কয়েকজনের নামও পাঁচিল ভাঙার ঘটনায় জড়িয়েছে । বিশ্বভারতীর ঘটনাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে বিজেপি । যারা মানুষ বলতে ধর্ম বোঝে, বিভেদ বোঝে, হিংসা বোঝে...তারা শান্তিনিকেতনের পরিবেশ উপলব্ধি করবে কীভাবে ?  রবীন্দ্রনাথের বোলপুর-শান্তিনিকেতনের লালমাটি যারা ছুঁইয়েই দেখেনি তারা কী বুঝবে আদিবাসী গান ! তারা কীভাবে চিনে নেবে খোয়াইয়ের পথ ! বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি নষ্ট করাতে যদি রাজ্যপাল এতই উদ্বিগ্ন হন তবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তছনছ করার সময় তিনি চুপ করেছিলেন কেন ?  এখন সত্যিই শান্তিনিকেতন বাঁচানোর সময়, বিশ্বভারতী বাঁচানোর সময় । মানব বন্ধন হয়ে ক্যাম্পাস আগলে রাখতে হবে আমাদেরই । ওরা আসবে, ওরা মারবে । কিন্তু আমাদের মানব বন্ধন ভাঙলে চলবে না । কারণ এই শান্তিনিকেতন আমাদের, বিশ্বের । এক স্বাধীনতার স্বপ্ন, মুক্তির স্বপ্ন, মুক্ত শিক্ষার স্বপ্ন । ওই দাঙ্গাবাজদের নয় । নিজেদের জীবনকে ওরা রবীন্দ্রনাথ দিয়ে বেষ্টিত করতে পারেনি, তাই শিক্ষাপরিসরকে ঘিরে ফেলতে চাইছে !

 

বিশ্বভারতী, যাদবপুর, জেএনইউ এক একটা উদাহরণ মাত্র । আসলে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকেই কবজায় করতে চায় ওরা । কারণ শুধু এই প্রজন্ম নয়, আগামী প্রজন্মকেও পঙ্গু করে দিতে চায় । ফ্যাসিবাদী সরকার প্রথমেই শিক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করবে, কারণ সেইখানেই তৈরি হয় বিরোধী মন । ছাত্র-ছাত্রীদের রাষ্ট্রের সামনে দেশদ্রোহী প্রমাণ করতে চাইবে কারণ তাঁরাই প্রশ্ন করার স্পর্ধা দেখায় । যার উত্তর দেওয়ার হিম্মত শাসকপক্ষের নেই । ওরা কী চায় ?  একটা পঙ্গু সমাজ ব্যবস্থা, যারা প্রশ্ন করতে জানে না । যারা অনুসরণ করে । এই সময় বিশ্বভারতীকে বাঁচানোর, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বাঁচানোর । এক ব্যারিকেড যা ঘিরে থাকুক শিক্ষাব্যবস্থা-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান । অন্তত শাসকগোষ্ঠী যেন সেই পরিসরে আঘাত না করতে পারে, ভাঙতে না পারে সেই ব্যারিকেড । রক্ত দিয়ে তৈরি ব্যারিকেড, স্পর্ধা ও শিক্ষার আলোকে তৈরি ব্যারিকেড...জীবন থাকতে যেন সেই ব্যারিকেড ভেঙে না পড়ে...