HAPPY READING...


Wednesday, 5 August 2020

৩৭০ প্রত্যাহারের এক বছর, রামমন্দির এবং অবিচ্ছেদ্য ভারত

আজ উৎসবের দিন, হ্যাঁ উৎসবই বটে!  যখন সারা দেশে 15 লাখের বেশি এক অসুখে আক্রান্ত, যখন 40 হাজারের কাছাকাছি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, পড়তে থাকা অর্থনীতির কারণে কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, অনেকেই অবসাদে আত্মহত্যা করেছেন, অনেকের মৃত্যু হয়েছে বাড়ি ফেরার পথে...ঠিক তখনই উৎসবের সময়! মন্দির উৎসব...ক্ষমতা প্রদর্শনের উৎসব । এক ধ্বংসের খেলা চলছে, অন্যায়ের তালিকা একটু একটু করে বাড়ছে আর আমরা সেই শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনও পথ নেই ।

 

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ে আমার জন্ম হয়নি । সেই সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে অতটাও অবগত নই, পড়েছিলাম কেবল । যতদিনে রাজনৈতিক চেতনা হয়েছে, কলেজের সেই দিনগুলোর থেকে 92 সালের মধ্যবর্তী দূরত্ব অনেকটাই...সেই সময় বম্বে দেখছি, দেখছি নাসিন । 92-র ওই সময়টার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি । মনে পড়ে য়ুনিভার্সিটি পড়তে বন্ধুদের মধ্যে একটা বাক্য নিয়ে খুব মজা হত, কিন্তু ভাবিনি সত্যিই এইদিনটা দেখবে ভারতবর্ষ । মন্দির ওখানেই তৈরি বানানো হবে ! মহাকাব্যকে যাঁরা ইতিহাস বলে ভেবে নিয়েছেন, তাঁদের বুদ্ধিমত্তার দৌড় কতদূর তা বোঝা যায় । একটা কাল্পনিক চরিত্রের ভিত্তিতে দীর্ঘ বছরের ইতিহাসকে ধ্বংস করে, জোর করে নিজেদের শক্তি, নিজেদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করা হল । দেশের আইনকে নিয়ন্ত্রণ করা হল, এই সময় উৎসবের নয় ? অবশ্যই উৎসবের ।

2019 ভারতের সংবিধানের, গণতন্ত্রের দুঃসময় । যখন পুরো দেশ মন্দির গড়ায় মেতেছে, সেই সময় এক কোণায় অন্ধকারে অত্যাচারে যন্ত্রণায় চোখের জল ফেলছে কাশ্মীর । কীভাবে ভুলে যাব, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ?  ঠিক একটা বছর, অথচ আমরা ভুলে গিয়েছি । পাশ কাটিয়েছে কেউ, এখন শিরোনাম রাম জন্মভূমিই । 2019-র 5 অগাস্ট 370 ধারা ও 35এ প্রত্যাহার করা হয়েছিল । বিশেষ মর্যাদা হারিয়েছিল কাশ্মীর, কেন্দ্রশাসিত দুই অঞ্চল তখন সম্পূর্ণ পরাধীন । রাতারাতি ইন্টারনেট, মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করে অন্ধকার যে কূপের মধ্যে কাশ্মীরকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, সেই কূপে গণতন্ত্র নেই, স্বাধীনতা নেই । আছে ফ্যাসিবাদী শাসন । এরপর সেখানে কত মৃত্যু হয়েছে, কত মানুষ হয়েছে নিখোঁজ আমরা জানি না । মাঝেমধ্যে প্রধানমন্ত্রী এসে বলে গিয়েছেন, কাশ্মীর ভাল আছে! কিন্তু সেই ভাল থাকার সংজ্ঞা কী ?  বেকারত্ব, মৃত্যু, যন্ত্রণা, অত্যাচার, কারফিউ ?  কাশ্মীরে চাকরি নেই; সম্প্রতি একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে, যে সাত মাস টানা কারফিউ ছিল কাশ্মীরে, সেই সময় ধসের মুথে পড়ছে কাশ্মীরের অর্থনীতি । প্রভাব পড়েছে ব্যবসায় । এক বছরে প্রায় 40 হাজার কোটির ক্ষতি হয়েছে কাশ্মীরে । ফল? বেকারত্ব, জীবিকাহীন জীবন, লোকসান...কোনও প্রদেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে গেলে সবার আগে অর্থনীতি  পরিকাঠামোটাই ভেঙে দেওয়া হয় । কাশ্মীরও সেই সমীকরণের বাইরে নয় । বারবার অধিকারের লড়াই লড়তে লড়তে, আর্থিক অবস্থানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিতে ওঁরাও ক্লান্ত । পেলেট গান, এনকাউন্টার, অত্যাচার এই সবকিছুর সঙ্গে অতঃপ্রতভাবে কাশ্মীরের জীবন জড়িয়ে গিয়েছে । কিন্তু আমাদেরও ভুললে চলবে না, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ।

 

আমরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের কথা ভুলে যাইনি । আমরা ভুলে যাইনি, বারবার ভারতের সংবিধানকে, প্রত্যেকের সাংবিধানিক অধিকারকে কীভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে শাসকদল । আমরা ভুলে যাইনি, ধর্মের নামে কীভাবে দেশের মধ্যে বিভাজন রেখা টানার চেষ্টা চলেছে । আমরা ভুলে যাইনি ।  আজ উৎসবের দিন, বর্ষপূর্তির উৎসব । ফ্যাসিবাদী সরকারের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম পদক্ষেপের আজ এক বছর, আজ উৎসব হবে না ? হয়তো খুব সন্তর্পণেই নির্বাচন করা হয়েছে, 5 অগাস্ট । যেই সময় মানুষ কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সামান্য হলেও ভাবত, সেই সময়ই রামজন্মভূমির উদযাপনে মেতেছে দেশ । গণতন্ত্রের আরও এক কালো দিন । মানুষকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, সেখানে প্রতিপত্তির প্রতিষ্ঠা । ক্ষমতার প্রতিষ্ঠান । নবারুণ লিখেছিলেন, এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না । আমরাও এক সময় ভেবেছি, না এই ভারত সেই স্বপ্নের ভারত নয়...এই দেশ আমার দেশ না । 250 বছরের ঔপনিবেশিক শাসন বিরুদ্ধতার ইতিহাস আমাদের যে সাহস দিয়েছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেইভাবে আমাদের লড়তে শিখিয়েছিল, কাঁটাতারের ক্ষতের উপর নতুন ভারতের স্বপ্ন প্রলেপ লাগিয়েছিল । সেই দেশ একটু একটু করে ধ্বংস হচ্ছে...আর্থিক মন্দা, বাড়তে থাকা বেকারত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা, মহামারি আরও কত কিছুর সঙ্গে লড়ব আমরা ?  একদিকে দেশ ধ্বংস হচ্ছে, আর একদিকে গড়া হচ্ছে মন্দির ! ইটের গায়ে রাম-নাম । একটা একটা ইট ক্ষমতার প্রকাশ । অন্যায়ের অভিব্যক্তি । সারা দেশ আনন্দে মেতেছে...আমরাও ভুলে গিয়েছি কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে আবার জারি হয়েছে কারফিউ...আবার সেখানে মৃত্যু হচ্ছে কারও । গণতন্ত্রের পতন---মন্দির গঠন । কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ । সেই দেশে কোথায় যেখানে মুক্তি রয়েছে , স্বাধীনতা রয়েছে ?


ছবি সৌজন্যে - গুগল

Tuesday, 28 July 2020

কোভিড সংক্রমণ ও অস্পৃশ্যতা : বর্বরতার সভ্যতা


আমরা কি অমানুষ হয়ে যাচ্ছি না কি ছিলাম ?

 


কোভিড-19 এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আমাদের । এই সময়ে কি আমরা আরও স্বার্থপর হয়ে উঠেছি না কি আমরা স্বার্থপরই ছিলাম ?  কোভিড শুধু আমাদের মুখোশের অন্তরালটিকে সর্বসম্মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে ?  আমি জানি না, ভাবতেও পারি না । অস্পৃশ্যতাহীন সমাজের স্বপ্ন দেখা যখনই শুরু করেছি, তার আগেই অস্পৃশ্যতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে । সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা সেই সত্যিকেই আরও স্পষ্ট করেছে । আর না, আমি অন্তত এইরকম একটা সমাজ চাইনি । বনগাঁর সরকারি হাসপাতালের যে ভিডিয়োটি প্রকাশ্য এসেছে, সেই ভিডিয়োটির কথা ভাবি । কী দেখলাম ? একটা মৃত্যু, যন্ত্রণা না কি বর্বরতা ? একটা যন্ত্রণাময় ভিডিয়ো, যা মানবসভ্যতাকে, মানবতাকে, মানবিকতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে । আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে, না আপনি মানুষ নন । হতে পারেন না । আপনিও এক স্বার্থপর যন্ত্রাংশ হয়ে উঠেছেন বা আগেই ছিলেন ।


শনিবার কোরোনার উপসর্গ নিয়ে বনগাঁ হাসপাতালে ভরতি হয়েছিলেন বনগাঁর বাসিন্দা মাধবনারায়ণ দত্ত । শরীরে কোরোনার উপসর্গ ছিল । ছিল শ্বাসকষ্ট । সেখানেই অবস্থার অবনতি হয় তাঁর । কোরোনা সন্দেহজনক হিসেবে তাঁকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ । একটা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও হয়েছিল, শুধু ছিল না সাহায্যের হাত । ওই হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ড থেকে বৃদ্ধকে বের করে এনেছিলেন তাঁর স্ত্রী । অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর প্রয়োজন ছিল, আশপাশের লোকজনকে ডাকছিলেন বারবার । বলছিলেন, দাদা আপনি তো মাস্ক পরে আছেন, আসুন না । একটু ধরুন না । অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিন না । না কেউ এগিয়ে আসেননি, সংক্রমণের ভয় ছিল যে... ততক্ষণে সেই হাসপাতাল চত্বরে আর যেই থাক, এককোণে দাঁড়িয়ে হেসেছিল স্বার্থপরতা আর সেখানেই মৃত্যু হয়েছিল মানুষের । না ওই বৃদ্ধের কথা লিখছি না । বৃদ্ধের শরীরের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু যে কয়েকজন মানুষ সেখানে ছিলেন তাঁদের অন্তরআত্মার মৃত্যু হয়েছিল সেখানে । বৃদ্ধ মাটিতে পড়ে যান, হয়তো প্রাণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন...তাঁর স্ত্রী তাঁকে নিয়ে কাকতি মিনতি করতে থাকেন । কিন্তু এগিয়ে আসেন না কেউ । এমনকি অ্যাম্বুলেন্স চালক, যিনি না কি পিপিই কিট পরেছিলেন...তিনিও এগিয়ে আসেননি । মাধববাবুর স্ত্রী তাঁকেও অনুরোধ করেছিলেন । বলেছিলেন, আপনি তো পিপিই পরে আছেন । একটু এগিয়ে আসুন না । বৃদ্ধের প্রয়োজন ছিল অক্সিজেনের । কারণ সেইসময় তাঁর শ্বাসযন্ত্র প্রায় বিকল । আমি জানি অক্সিজেন না পাওয়ার যন্ত্রণা কেমন হয় । আমি জানি, বাতাসে অনেক অক্সিজেন রয়েছে, কিন্তু তুমি নিতে পারবে না...সেই অনুভূতি ঠিক কেমন হয় ! আমি এও জানি, কাছের মানুষকে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতড়াতে দেখলে কী অনুভব হয় !

যাকগে, বৃদ্ধের বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা, তাঁর স্ত্রীর কাকতি মিনতি...এইরকম কতক্ষণ ঠিক চলেছিল?  আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একটা মানুষ একটু জীবনের জন্য কাতড়াচ্ছিলেন আর আমরা এই যাদের অনেকটা মানুষের মতোই দেখতে তারা পাশ কাটিয়েছিলাম, সংক্রমণের ভয়ে! অ্যাম্বুলেন্সে টেনে হিঁচড়ে ওঠানোর চেষ্টা করেছিলেন মাধববাবুর স্ত্রীই । কিন্তু শেষরক্ষা হযনি, ওইখানে পড়ে যান বৃদ্ধ । মারা যান । তখনও তাঁর স্ত্রী বলে যাচ্ছেন, দাদা ট্রে টা একটু নামান না !  আশপাশের ব্যক্তিরা বলেছিলেন, "কাকা উঠে পড়ুন, উঠতে পারলেই বেঁচে যাবেন!" না আর বাঁচা হয়নি তাঁর । উঠতে পারেননি তিনি ।


আসলে আমরাই বুঝিনি । সংক্রমণ ছড়িয়ে গিয়েছে । যে ভয় আমাদের স্বার্থপরতার শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, সেই ভয় কী তা বুঝে ওঠার আগেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে । বর্বরতার সংক্রমণ, অমানবিকতার সংক্রমণ । আর আমরা সবাই সংক্রমিত ।

এই সমাজের কোশে কোশে শ্রেণিবিভাজন রয়েছে, বৈষম্য রয়েছে । না আমি এখানে মার্কসবাদী কোনও তত্ত্ব নিয়ে বড় বড় কথা লিখছি না । আমি লিখছি, সপাট সত্যির কথা । প্রতিবছর যক্ষ্মায় কত মানুষ মারা যান তার হিসেব আমরা রাখিনি, কারণ যক্ষ্মা অধিকংশক্ষেত্রেই সেই নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । আমরা ভেবে দেখিনি । কারও রক্ত উঠছে শুনলে নাক সিঁটকেছি । জরাজীর্ণ কঙ্কালসার চেহারা দেখে আঁতকে উঠেছি, তাও আমাদের খারাপ লাগেনি । কিন্তু কোভিড কাউকে ছাড়েনি । জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ নির্বিশেষে হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছে । বহুতল আবাসনের প্রত্যেকে আক্রান্ত হয়েছেন, প্রিভিলেজড শ্রেণিটির সাজানো সুন্দর অন্দরে অসুখ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে । আর তাই আমাদের টনক নড়েছে । আমাদের মধ্যে লুকিয়ে রাখা বিবর নিজেকে গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তখন । এই যে অস্পৃশ্যতায় মেতেছে মানুষ, সামাজিক দূরত্ব-র নামে অমানবিকতার খোড়াক পুষেছে, এই অস্পৃশ্যতা নতুন নয় । এর শিকড় অনেক গভীর, শুধু ভিন্ন নামে প্রকাশ্যে এসেছে । ভারত সেই দেশটাই, যেখানে কলার টিউনে বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়, রোগের সঙ্গে লড়ুন, রোগীর সঙ্গে নয় । ওঁদের সঙ্গে ভেদাভেদ করবেন না । হ্যাঁ ঠিক, এটাই আমার দেশ । এটাই আমরা । একটা বর্বর, কুৎসিত মুখ । আমাদের সামনে মানুষের মৃত্যু দেখলেও আমরা এগিয়ে যাব না, সাহায্যের একটা হাত বাড়িয়ে দেব না । কারণ আমাদের মৃত্যু ভয় আছে, সংক্রমণ ভয় আছে । আসলে আমাদের একটাই অসুখ আছে, স্বার্থপরতা! এর বাইরে আমরা বের হতে পারিনি । তাই মানুষের কান্নায় পাশে দাঁড়াতে পারিনি, মৃত্যুতে বন্ধু হতে পারিনি । বাঁচার আশা জোগাতে পারিনি । কারণ আমরা বাঁচতে চেয়েছিলাম । এই সমাজ বিশ্বাসঘাতক, আমরা প্রত্যেকেই এক একজন বিশ্বাসঘাতক । যাঁরা যুগের পর যুগ বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছি, নীতাদের সঙ্গে । আমরা তাঁদের বাঁচতে দিইনি, কারণ আমরা নিজেরা বাঁচতে চেয়েছিলাম । মেঘে ঢাকা তারার শেষ দৃশ্য আমাদের বিশ্বাসঘাতক চেহারাটিকে প্রকাশ্যে এনেছিল । আসলে আমরা জানি না, স্বার্থপরতা, শ্রেণিবিভেদ, লিঙ্গবৈষম্য, বর্বরতা, অস্পৃশ্যতা আমাদের শরীরে ছড়িয়েছে । প্রত্যেকের মৃত্যু হয়েছে, যাঁরা ঘুরছি তাঁরা লাশ । এক একটি নরখাদক লাশ ... আমরা প্রত্যেকেই এই পাপের ভাগীদার!

Thursday, 25 June 2020

বুলবুল : এক ডিসটোপিয়ান রূপকথা এবং নারীবাদ



বুলবুল ছবি মূলত যে আখ্যান নির্ভর, সেই গল্পটা আমাদের সবার জানা । সেই গল্পটা আমাদের ঠাকুমা বা দিদিমারা করে থাকেন । এক গ্রামে এক ডাইনির গল্প... একটা রূপকথা, কিংবা একটা ডিসটোপিয়া । একটি চরিত্র নির্ভর গল্প, যে চরিত্রটি গল্পের অন্ধকার অংশগুলো আরও অনেক বেশি স্পষ্ট করে তোলে । এখন বিষয়টি হচ্ছে, দৃষ্টিকোণ বা পার্সপেক্টিভ । বুলবুল হয়তো সেই পার্সেপেক্টিভ নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করতে চেয়েছে । একটা ডাইনি যার দুটো ডানা রয়েছে, বা একটা পরী যার পায়ের পাতা উল্টো ... আমরা কোন নারীর গল্প পড়ছি ?




এই ছবির আখ্যান পরিকাঠামোয় সময় একটা বড় চরিত্র পালন করে । কখনও 1881 সালে ফিরে যাই আমরা, কখনও তার 20 বছর পরের সময় দেখি আবার এরই মধ্যে পাঁচবছর পূর্ববর্তী সময়ে বর্বরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে । এই সময়রেখা বুলবুলের(ছবির প্রধান চরিত্র, তার নামেই ছবির নাম) স্মৃতি । বারবার নৃশংসতার সেই অতীতকে ফিরে দেখে সে ।


1881 সাল । অবিভক্ত বাংলা । বুলবুলের বিয়ে হয় এক ঠাকুর পরিবারে । তখন তার বয়স খুব বেশি হলে দশ বছর হবে । অন্যদিকে তার স্বামী তার থেকে অনেক বড় । বুলবুল বুঝতেও পারে না, তার সঙ্গে কী হচ্ছে । বুলবুল বুঝতে পারে না তার স্বামী কে ?  তারই বয়সী তার ছোটো দেওরকে সে তার বর ভেবে বসে । এরপর সময় এগোয়... উচ্চবিত্ত ঠাকুরবাড়ির পিতৃতান্ত্রিক অন্দরমহল একটু একটু করে বেঁধে ফেলে বুলবুলকে । মনে করিয়ে দেয় তার বিয়ের সন্ধ্যার কথা... যখন তার পিসি তার পায়ের আঙুলে গহনা পরানোর সময় বলেছিল, এটা পরানো হয় স্নায়ু নিয়ন্ত্রণের জন্য, যাতে পাখি উড়ে না যায় ছোট্টো বুলবুলও জিজ্ঞাসা করে, পিসিমা নিয়ন্ত্রণ করা কী ? কারণ পাখির মতো একটা প্রাণ তখন জানেও না   উচ্চবংশীয় হিন্দু পরিবারের অন্দরমহলের দেওয়ালে কটা অদৃশ্য লোহার শিকল বাঁধা আছে । 
ছোটো বয়সে বুলবুলের অভিনয়ে রুচি মহাজন

বুলবুলের চরিত্রে তৃপ্তি দিমরি


অন্দরমহল নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে অন্য একটি ছবির প্রসঙ্গে লিখতে খুব ইচ্ছে করছে । অন্দরমহলের নিপীড়ণ, বাঁধন, যন্ত্রণা, অত্যাচার তো কখনও পরিবর্তন হয় না । আখ্যান বিশেষে সময় ও পরিসর পাল্টে নেয় কেবল । ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্তরমহল আমাদের এক জমিদার বাড়ির ঐতিহ্যের আড়াল করা বর্বর পিতৃতন্ত্রের চেহারা দেখিয়েছে । আমরাও দেখেছি, কীভাবে নিজ স্বার্থে পর্দার আড়ালে রাখা গৃহিনীকে ব্যবহার করে এসেছে একটা পরিবার । পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদ আমাদের পূর্ব পরিচিত । কীভাবে প্রতি মুহূর্তে হিন্দু সমাজ একজন মেয়ের যৌনতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, কী কী বর্বর, কুৎসিত পদক্ষেপ করেছে তার একাধিক দৃষ্টান্তর সঙ্গে পরিচিত আমরা । অনভিতা দত্তর বুলবুল সেই অন্দরমহলের পরিসরকেই আবার দৃশ্যায়িত করে । একটা রূপকথার আড়ালে লেখে নারীবাদী উপকথা ।


ইন্দ্রনীলের(অভিনয়ে রাহুল বোস, যিনি ছবিতে দুইটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন) সঙ্গে বিয়ে হলেও আসলে দেওর সত্যকেই (অভিনয়ে অবিনাশ তিওয়ারি)ভালবেসেছিল বুলবুল(অভিনয়ে তৃপ্তি দিমরি) । যে তাকে সেই ভয়ের গল্প শোনাত, এক ডাইনির গল্প শোনাত । সত্যর সঙ্গে দিনযাপন, একসঙ্গে বেড়ে ওঠাকে বুলবুল অজান্তেই জীবন বানিয়ে নেয় । এরপর একদিন বিচ্ছেদ আসে । এই বিচ্ছেদ আমাদের পূর্বপরিচিত । বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা বিরহ এই বিচ্ছেদ যন্ত্রণা আমাদের অনেক আগেই অনুভব করতে শিখিয়েছে । কারণ ছবির সঙ্গীত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের গল্প বলে । সত্যর প্রতি বুলবুলের অনুভূতির কথা জানতে পেরে, সত্যকে বিলেতে পড়তে পাঠিয়ে দেয় ইন্দ্রনীল । আর বুলবুল সদ্য খসে পড়া তারার ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে থাকে । পুড়িয়ে ফেলে ভালবাসার উপন্যাসের পাতা, এই আগুন বুলবুলের আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করেছিল । বিরহ যন্ত্রণায় ডানা কাটা পরী অন্দরমহলে গুমরে মরেছিল । এক জানলা থেকে অন্য জানলায় ছুটে বেরিয়েছিল মুক্তির জন্য, কিন্তু সে তখনও জানত না অন্দরমহলের অদৃশ্য শিকলে ইতিমধ্যেই তার পা বাঁধা পড়েছে ।

ভয়রা কথা রাখে । জটায়ুর ডানা কেটে দেওয়ার মুহূর্তের চিত্রপট লেইট মোটিফ হয়ে ওঠে, পরীর ডানার ভাঙা অংশের রক্ত বা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া গোড়ালি থেকে রক্ত বেরিয়ে ছিটকে লাগে অন্দরমহলের দেওয়ালে । চিত্রপটের উপর, ঐতিহ্যের গায়ে । ইন্দ্রনীলের চোখেমুখে । সেই দৃশ্যের একটাই রং... লাল । খসে যাওয়া ডানার যন্ত্রণা অনুভবের আগেই অচেতন হয়ে যায় পরী, ঘুম ভাঙে আরও এক নৃশংসতার ভোরে । অন্দরমহলের বড় বড় পালঙ্কে তখনও রক্তের দাগ শোকায়নি । চিকিৎসক সুদীপ(অভিনয়ে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) সবেই সেই ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়ে গিয়েছে । পিতৃতান্ত্রিক বর্বরতায় , যৌন অত্যাচারে পরীর যোনি থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় । মৃত্যু হয় মুক্তির, মৃত্যু হয় ডানার । মৃত্যু হয় ইওটোপিয়ান রূপকথার । দৃশ্যে ফিরে আসে লাল রঙ । আকাশে লাল চাঁদ দেখা যায় । জন্ম হয় আরও এক পরীর, তবে তার ডানা নেই । আছে উল্টানো পা, ঔদ্ধত্য এবং নিয়ম ভেঙে বেরিয়ে আসার সাহস । পরজন্মে পালঙ্কের চারপাশে কাশবন, আর লাল রং । সেই রং রক্তের না আন্দোলনের না রূপকথার তা জানি না । 




ছবির আরও এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বিনোদিনী (অভিনয়ে পাওলি দাম)। বুলবুলের জা, ইন্দ্রনীলের জমজ ভাইয়ের স্ত্রী । যে বুলবুলের থেকে অনেক বড় হলেও তাকে বুলবুলকে বড় বউ বলে ডাকতে হয় । বিনোদিনী সেই নারী যে অন্দরমহলের মধ্যে থাকতে থাকতে নারীবিদ্বেষকে ইতিমধ্যেই গলদ্ধকরণ করেছে । বুলবুলের উপর অত্যাচারের পরও বুলবুলকে চুপ করে থাকতে শেখায় সে । তার সংলাপে আসে বশ্যতা ।


সময় আবার বছর 20 পর । বিলেত ফেরত সত্য সুদীপের সঙ্গে বুলবুলের বন্ধুত্ব দেখে হিংসা করে । তার পৌরুষ তাকে বর্বর বানায় । সুদীপ বুলবুলের পায়ের চিকিৎসা করার সময় সত্য সেখানে চলে আসে  এবং বুলবুলকে কটাক্ষ করে বলে, বৌদি আপনি নিজেকে পর্দার আড়ালও করেননি । তার প্রত্যেকটা কথায় ফিরে আসে পুরুষত্বের হিংস্রতা । বৌদির প্রতি সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ । এরই মধ্যে গ্রামে একটার পর একটা নৃশংস খুন হতে থাকে । সবাই ভাবে, সেই ডাইনি এসে খুন করে রক্ত খাচ্ছে । খুন হয় ইন্দ্রনীলের ভাই, খুন হয়ে যায় গ্রামের মাস্টার । সত্য সত্যের সন্ধান করে  । সেও খুঁজে বের করতে চায় কে এই খুন করছে । অন্তত, সে বিশ্বাস করত কোনও ডাইনি নয় , এই খুন মানুষের । অন্তত কোনও পুরুষ মানুষ...কারণ একজন নারী এত নৃশংস হতে পারে না ।


তার কথার সঙ্গে কন্ট্রাস্ট তৈরি করে ছবির দৃশ্য । হিন্দু পুরাণের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় । লাল রং এবং কালীপুজোর রাত ... আলো আঁধারি একটি খুনের স্মৃতি ভুলতে না ভুলতেই অন্য একটি খুন হয়ে যায় ।

ডাইনি নিয়ে যে গল্প কথা প্রচলিত রয়েছে, তা অবশ্যই পিতৃতান্ত্রিক । একজন মেয়ে যাকে অন্তত সমাজের নিয়মে বেঁধে ফেলা যায়নি তাকে ডাইনি বলে সম্বোধন করা হয়েছে যুগযুগ ধরে । ডাইনি সন্দেহে নির্দোষ মেয়েদের পুড়িয়ে মারার একাধিক খবর আমরা জেনেছি, কিন্তু আমরা কিছু করিনি । নৃশংসতাই কি ডাইনির আসল পরিচয় ? সে রক্ত খায় , সে মানুষ খুন করে ? কোনও দেবীও কি রক্ত পান করেননি ?

ডিসটোপিয়ান এক আখ্যান কাঠামো আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে । জোর করে দেখানো হয় নৃশংসতা, যন্ত্রণা, মৃত্যু । ছবির সঙ্গীত এবং উগ্র রঙ ভয়ের গল্প বুনন করে । এইদিকে ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফি, আলোর ব্যবহার, আর্ট ডিরেকশন বাস্তবেই এক পরাবাস্তববাদের ছবি আঁকে । সেখানে কখনও জানলা দিয়ে লাল আলো এসে পড়ে, কখনও বুলবুলের পালঙ্কের চারপাশে ভরে ওঠে কাশবন । আবার অত্যাচারের যন্ত্রণা আগুন হয়ে পুড়ে যায় কোনও দৃশ্যে ।

তবে ছবির ভয়ের জায়গাটা ঠিক কোথায়, অর্থাৎ ছবির যে জঁরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে--- হরর । সেই ভয়টা কোথায় ? ডিসটোপিয়ান রূপকথায়, বাংলার ইতিহাসে, খুনের নৃশংসতায় না কি জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের নিষ্ঠুর বর্বরতায় ? না কি সেই ডাইনির উল্টানো পায়ের পাতায় যেখানে পুরনো রক্তের দাগ লেগে রয়েছে ?


ছবির দৃশ্যপট, চিত্রনাট্য হয়তো আরও মজবুত হতে পারত । ঔদ্ধত্য ভয় দেখাতে পারত অন্দরমহলের কুঠুরিতে । নিজেকে পর্দার আড়াল থেকে বের করে আনা জমিদার বংশের গৃহিনীর চরিত্রের শাখা প্রশাখা আরও দূর বিস্তৃত হতে পারত । নারীবিদ্বেষী , ক্রীতদাসের মতো চরিত্র বিনোদিনী । সেই চরিত্রের শিকড়ে পৌঁছানো যেত । কিন্তু সেইসব ছবিতে হয়নি, বরং দাবানল এবং উগ্র লাল রঙ এইসব সত্যিকে ছাপিয়ে গিয়েছে কোথাও । ফিরেছে রূপকের জন্ম-মৃত্যু... পরাবাস্তববাদ স্মৃতির চৌকাঠে একাকিত্বের পাশে দাঁড় করিয়েছে ইন্দ্রনীলকে । তখন জমিদার বাড়ির উঠোনে শুধুই কাশবন । যেন শরতের সময়, যেন ষষ্ঠীর শুভ লগ্নে অকালবোধন । চক্ষু দান হবে দেবীর, তিনি অস্ত্র তুলে নেবেন । মাথা কেটে নেবেন আরও এক অত্যাচারীর...রক্ত পান করবেন তারপর ।  উল্টানো পায়ের পাতায় তখনও শুকনো রক্তের দাগ, দাবানলেই চিরন্তন সেই পরীর উপাখ্যান ।


ছবি সৌজন্যে - নেটফ্লিক্স এবং গুগল । (প্রত্যেকটি ছবি বুলবুল ছবি থেকে সংগৃহীত)