HAPPY READING...


Thursday, 25 June 2020

বুলবুল : এক ডিসটোপিয়ান রূপকথা এবং নারীবাদ



বুলবুল ছবি মূলত যে আখ্যান নির্ভর, সেই গল্পটা আমাদের সবার জানা । সেই গল্পটা আমাদের ঠাকুমা বা দিদিমারা করে থাকেন । এক গ্রামে এক ডাইনির গল্প... একটা রূপকথা, কিংবা একটা ডিসটোপিয়া । একটি চরিত্র নির্ভর গল্প, যে চরিত্রটি গল্পের অন্ধকার অংশগুলো আরও অনেক বেশি স্পষ্ট করে তোলে । এখন বিষয়টি হচ্ছে, দৃষ্টিকোণ বা পার্সপেক্টিভ । বুলবুল হয়তো সেই পার্সেপেক্টিভ নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করতে চেয়েছে । একটা ডাইনি যার দুটো ডানা রয়েছে, বা একটা পরী যার পায়ের পাতা উল্টো ... আমরা কোন নারীর গল্প পড়ছি ?




এই ছবির আখ্যান পরিকাঠামোয় সময় একটা বড় চরিত্র পালন করে । কখনও 1881 সালে ফিরে যাই আমরা, কখনও তার 20 বছর পরের সময় দেখি আবার এরই মধ্যে পাঁচবছর পূর্ববর্তী সময়ে বর্বরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে । এই সময়রেখা বুলবুলের(ছবির প্রধান চরিত্র, তার নামেই ছবির নাম) স্মৃতি । বারবার নৃশংসতার সেই অতীতকে ফিরে দেখে সে ।


1881 সাল । অবিভক্ত বাংলা । বুলবুলের বিয়ে হয় এক ঠাকুর পরিবারে । তখন তার বয়স খুব বেশি হলে দশ বছর হবে । অন্যদিকে তার স্বামী তার থেকে অনেক বড় । বুলবুল বুঝতেও পারে না, তার সঙ্গে কী হচ্ছে । বুলবুল বুঝতে পারে না তার স্বামী কে ?  তারই বয়সী তার ছোটো দেওরকে সে তার বর ভেবে বসে । এরপর সময় এগোয়... উচ্চবিত্ত ঠাকুরবাড়ির পিতৃতান্ত্রিক অন্দরমহল একটু একটু করে বেঁধে ফেলে বুলবুলকে । মনে করিয়ে দেয় তার বিয়ের সন্ধ্যার কথা... যখন তার পিসি তার পায়ের আঙুলে গহনা পরানোর সময় বলেছিল, এটা পরানো হয় স্নায়ু নিয়ন্ত্রণের জন্য, যাতে পাখি উড়ে না যায় ছোট্টো বুলবুলও জিজ্ঞাসা করে, পিসিমা নিয়ন্ত্রণ করা কী ? কারণ পাখির মতো একটা প্রাণ তখন জানেও না   উচ্চবংশীয় হিন্দু পরিবারের অন্দরমহলের দেওয়ালে কটা অদৃশ্য লোহার শিকল বাঁধা আছে । 
ছোটো বয়সে বুলবুলের অভিনয়ে রুচি মহাজন

বুলবুলের চরিত্রে তৃপ্তি দিমরি


অন্দরমহল নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে অন্য একটি ছবির প্রসঙ্গে লিখতে খুব ইচ্ছে করছে । অন্দরমহলের নিপীড়ণ, বাঁধন, যন্ত্রণা, অত্যাচার তো কখনও পরিবর্তন হয় না । আখ্যান বিশেষে সময় ও পরিসর পাল্টে নেয় কেবল । ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্তরমহল আমাদের এক জমিদার বাড়ির ঐতিহ্যের আড়াল করা বর্বর পিতৃতন্ত্রের চেহারা দেখিয়েছে । আমরাও দেখেছি, কীভাবে নিজ স্বার্থে পর্দার আড়ালে রাখা গৃহিনীকে ব্যবহার করে এসেছে একটা পরিবার । পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদ আমাদের পূর্ব পরিচিত । কীভাবে প্রতি মুহূর্তে হিন্দু সমাজ একজন মেয়ের যৌনতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, কী কী বর্বর, কুৎসিত পদক্ষেপ করেছে তার একাধিক দৃষ্টান্তর সঙ্গে পরিচিত আমরা । অনভিতা দত্তর বুলবুল সেই অন্দরমহলের পরিসরকেই আবার দৃশ্যায়িত করে । একটা রূপকথার আড়ালে লেখে নারীবাদী উপকথা ।


ইন্দ্রনীলের(অভিনয়ে রাহুল বোস, যিনি ছবিতে দুইটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন) সঙ্গে বিয়ে হলেও আসলে দেওর সত্যকেই (অভিনয়ে অবিনাশ তিওয়ারি)ভালবেসেছিল বুলবুল(অভিনয়ে তৃপ্তি দিমরি) । যে তাকে সেই ভয়ের গল্প শোনাত, এক ডাইনির গল্প শোনাত । সত্যর সঙ্গে দিনযাপন, একসঙ্গে বেড়ে ওঠাকে বুলবুল অজান্তেই জীবন বানিয়ে নেয় । এরপর একদিন বিচ্ছেদ আসে । এই বিচ্ছেদ আমাদের পূর্বপরিচিত । বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা বিরহ এই বিচ্ছেদ যন্ত্রণা আমাদের অনেক আগেই অনুভব করতে শিখিয়েছে । কারণ ছবির সঙ্গীত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের গল্প বলে । সত্যর প্রতি বুলবুলের অনুভূতির কথা জানতে পেরে, সত্যকে বিলেতে পড়তে পাঠিয়ে দেয় ইন্দ্রনীল । আর বুলবুল সদ্য খসে পড়া তারার ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে থাকে । পুড়িয়ে ফেলে ভালবাসার উপন্যাসের পাতা, এই আগুন বুলবুলের আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করেছিল । বিরহ যন্ত্রণায় ডানা কাটা পরী অন্দরমহলে গুমরে মরেছিল । এক জানলা থেকে অন্য জানলায় ছুটে বেরিয়েছিল মুক্তির জন্য, কিন্তু সে তখনও জানত না অন্দরমহলের অদৃশ্য শিকলে ইতিমধ্যেই তার পা বাঁধা পড়েছে ।

ভয়রা কথা রাখে । জটায়ুর ডানা কেটে দেওয়ার মুহূর্তের চিত্রপট লেইট মোটিফ হয়ে ওঠে, পরীর ডানার ভাঙা অংশের রক্ত বা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া গোড়ালি থেকে রক্ত বেরিয়ে ছিটকে লাগে অন্দরমহলের দেওয়ালে । চিত্রপটের উপর, ঐতিহ্যের গায়ে । ইন্দ্রনীলের চোখেমুখে । সেই দৃশ্যের একটাই রং... লাল । খসে যাওয়া ডানার যন্ত্রণা অনুভবের আগেই অচেতন হয়ে যায় পরী, ঘুম ভাঙে আরও এক নৃশংসতার ভোরে । অন্দরমহলের বড় বড় পালঙ্কে তখনও রক্তের দাগ শোকায়নি । চিকিৎসক সুদীপ(অভিনয়ে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) সবেই সেই ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়ে গিয়েছে । পিতৃতান্ত্রিক বর্বরতায় , যৌন অত্যাচারে পরীর যোনি থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় । মৃত্যু হয় মুক্তির, মৃত্যু হয় ডানার । মৃত্যু হয় ইওটোপিয়ান রূপকথার । দৃশ্যে ফিরে আসে লাল রঙ । আকাশে লাল চাঁদ দেখা যায় । জন্ম হয় আরও এক পরীর, তবে তার ডানা নেই । আছে উল্টানো পা, ঔদ্ধত্য এবং নিয়ম ভেঙে বেরিয়ে আসার সাহস । পরজন্মে পালঙ্কের চারপাশে কাশবন, আর লাল রং । সেই রং রক্তের না আন্দোলনের না রূপকথার তা জানি না । 




ছবির আরও এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বিনোদিনী (অভিনয়ে পাওলি দাম)। বুলবুলের জা, ইন্দ্রনীলের জমজ ভাইয়ের স্ত্রী । যে বুলবুলের থেকে অনেক বড় হলেও তাকে বুলবুলকে বড় বউ বলে ডাকতে হয় । বিনোদিনী সেই নারী যে অন্দরমহলের মধ্যে থাকতে থাকতে নারীবিদ্বেষকে ইতিমধ্যেই গলদ্ধকরণ করেছে । বুলবুলের উপর অত্যাচারের পরও বুলবুলকে চুপ করে থাকতে শেখায় সে । তার সংলাপে আসে বশ্যতা ।


সময় আবার বছর 20 পর । বিলেত ফেরত সত্য সুদীপের সঙ্গে বুলবুলের বন্ধুত্ব দেখে হিংসা করে । তার পৌরুষ তাকে বর্বর বানায় । সুদীপ বুলবুলের পায়ের চিকিৎসা করার সময় সত্য সেখানে চলে আসে  এবং বুলবুলকে কটাক্ষ করে বলে, বৌদি আপনি নিজেকে পর্দার আড়ালও করেননি । তার প্রত্যেকটা কথায় ফিরে আসে পুরুষত্বের হিংস্রতা । বৌদির প্রতি সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ । এরই মধ্যে গ্রামে একটার পর একটা নৃশংস খুন হতে থাকে । সবাই ভাবে, সেই ডাইনি এসে খুন করে রক্ত খাচ্ছে । খুন হয় ইন্দ্রনীলের ভাই, খুন হয়ে যায় গ্রামের মাস্টার । সত্য সত্যের সন্ধান করে  । সেও খুঁজে বের করতে চায় কে এই খুন করছে । অন্তত, সে বিশ্বাস করত কোনও ডাইনি নয় , এই খুন মানুষের । অন্তত কোনও পুরুষ মানুষ...কারণ একজন নারী এত নৃশংস হতে পারে না ।


তার কথার সঙ্গে কন্ট্রাস্ট তৈরি করে ছবির দৃশ্য । হিন্দু পুরাণের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় । লাল রং এবং কালীপুজোর রাত ... আলো আঁধারি একটি খুনের স্মৃতি ভুলতে না ভুলতেই অন্য একটি খুন হয়ে যায় ।

ডাইনি নিয়ে যে গল্প কথা প্রচলিত রয়েছে, তা অবশ্যই পিতৃতান্ত্রিক । একজন মেয়ে যাকে অন্তত সমাজের নিয়মে বেঁধে ফেলা যায়নি তাকে ডাইনি বলে সম্বোধন করা হয়েছে যুগযুগ ধরে । ডাইনি সন্দেহে নির্দোষ মেয়েদের পুড়িয়ে মারার একাধিক খবর আমরা জেনেছি, কিন্তু আমরা কিছু করিনি । নৃশংসতাই কি ডাইনির আসল পরিচয় ? সে রক্ত খায় , সে মানুষ খুন করে ? কোনও দেবীও কি রক্ত পান করেননি ?

ডিসটোপিয়ান এক আখ্যান কাঠামো আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে । জোর করে দেখানো হয় নৃশংসতা, যন্ত্রণা, মৃত্যু । ছবির সঙ্গীত এবং উগ্র রঙ ভয়ের গল্প বুনন করে । এইদিকে ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফি, আলোর ব্যবহার, আর্ট ডিরেকশন বাস্তবেই এক পরাবাস্তববাদের ছবি আঁকে । সেখানে কখনও জানলা দিয়ে লাল আলো এসে পড়ে, কখনও বুলবুলের পালঙ্কের চারপাশে ভরে ওঠে কাশবন । আবার অত্যাচারের যন্ত্রণা আগুন হয়ে পুড়ে যায় কোনও দৃশ্যে ।

তবে ছবির ভয়ের জায়গাটা ঠিক কোথায়, অর্থাৎ ছবির যে জঁরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে--- হরর । সেই ভয়টা কোথায় ? ডিসটোপিয়ান রূপকথায়, বাংলার ইতিহাসে, খুনের নৃশংসতায় না কি জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের নিষ্ঠুর বর্বরতায় ? না কি সেই ডাইনির উল্টানো পায়ের পাতায় যেখানে পুরনো রক্তের দাগ লেগে রয়েছে ?


ছবির দৃশ্যপট, চিত্রনাট্য হয়তো আরও মজবুত হতে পারত । ঔদ্ধত্য ভয় দেখাতে পারত অন্দরমহলের কুঠুরিতে । নিজেকে পর্দার আড়াল থেকে বের করে আনা জমিদার বংশের গৃহিনীর চরিত্রের শাখা প্রশাখা আরও দূর বিস্তৃত হতে পারত । নারীবিদ্বেষী , ক্রীতদাসের মতো চরিত্র বিনোদিনী । সেই চরিত্রের শিকড়ে পৌঁছানো যেত । কিন্তু সেইসব ছবিতে হয়নি, বরং দাবানল এবং উগ্র লাল রঙ এইসব সত্যিকে ছাপিয়ে গিয়েছে কোথাও । ফিরেছে রূপকের জন্ম-মৃত্যু... পরাবাস্তববাদ স্মৃতির চৌকাঠে একাকিত্বের পাশে দাঁড় করিয়েছে ইন্দ্রনীলকে । তখন জমিদার বাড়ির উঠোনে শুধুই কাশবন । যেন শরতের সময়, যেন ষষ্ঠীর শুভ লগ্নে অকালবোধন । চক্ষু দান হবে দেবীর, তিনি অস্ত্র তুলে নেবেন । মাথা কেটে নেবেন আরও এক অত্যাচারীর...রক্ত পান করবেন তারপর ।  উল্টানো পায়ের পাতায় তখনও শুকনো রক্তের দাগ, দাবানলেই চিরন্তন সেই পরীর উপাখ্যান ।


ছবি সৌজন্যে - নেটফ্লিক্স এবং গুগল । (প্রত্যেকটি ছবি বুলবুল ছবি থেকে সংগৃহীত)

Thursday, 18 June 2020

নক্ষত্রপতন এবং বৃষ্টিবিকেল

যতবার শহর ছেড়ে এসেছি, একটা দুঃস্বপ্নের কথা মনে পড়েছে । সেই এক অদ্ভুত দুঃস্বপ্ব, যার কোনও শেষ নেই । একটা শুরু আছে কেবল । অন্তহীন এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে রয়েছি । মাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট এবং শহর ছেড়ে আসার অনুভূতিটা অনেকটা একরকম । আমার দোতলার ঘর, বারান্দার ফুল গাছ আর কাচের ভিতর রাখা রঙিন মাছ এসবই বাড়ি ছেড়ে আসার আগে শেষবারের জন্য স্মৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে জোর করে । আমাদের নিচের ঘর, বাবার শার্টের বোতাম অনেক পুরাতন হয়েছে । তার থেকেও পুরাতন হয়েছে বার্মা সেগুনের খাটটা । যদিও আমার কাছে সবথেকে পুরাতন নিচের ঘরের আলমারিটা, যার মধ্যে রাখা মায়ের গন্ধ । যে শাড়িগুলো ছুঁলে মনে হয় মাকে ছুঁয়ে দেখলাম । মায়ের চেয়ে আদিম এই পৃথিবীতে কী আছে, আমার জানা  নেই ।


আজও এইখানে বৃষ্টি এল । বিকেলে কাজ করার সময় মেঘ করে এল , মনে হল এইতো মন খারাপ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের জলে নৌকা ভাসানো যাবে । হঠাৎ করেই বাড়ি ছেড়ে আসার দিনটার কথা মনে পড়ল । ভোরবেলা এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য যখন গাড়িটা পাড়ার মধ্যে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়টা । আমি পিছনে ঘুরে বাবাকে দেখার চেষ্টা করছি, যতদূর বাবাকে দেখা যায় । বাবাও দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে । এর থেকে যন্ত্রণার সময় আর হয় কি, জানা নেই । আমার ঠাম্মার সঙ্গে গল্প, আর নির্ভেজাল সন্ধ্যাগুলোর কথা মনে পড়ল । আমি কাগজের নৌকা বানালাম । বৃষ্টি নামতেই স্মৃতির নাম ওদের গায়ে লিখে ভাসিয়ে দিলাম, ওরাও নিজের মত ঠিকানা খুঁজে নিচ্ছিল । কেউ মায়ের শাড়ির আঁচলে মুছে নিচ্ছিল চোখ, কেউ বাবার সবথেকে পুরাতন শার্টের বোতাম চুরি করে পকেটে ভরছিল, কেউ ঠাম্মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ছিল কিছু না ভেবেই । আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ঠায় বৃষ্টির জলে ভাসছি, আর দেখছি নৌকারা খুঁজে নিচ্ছে নিজেদের ঠিকানা । আমি এখনও বুঝিনি, আমায় হায়দরাবাদের ফ্ল্যাটের ছাদ বেশি প্রিয় না কি বাড়ির বারান্দা । আমার বইয়ের তাক বেশি প্রিয় না কি এক কামরার ভাড়ার এই ছোট্টো ফ্ল্যাটটা । আমি বুঝিনি আমার প্রিয় বন্ধুর নাম কী, আমি এখনও খুঁজে পাইনি আমার প্রেমিকের ঠিকানা । শুধু জানি, কোনও এক পাহাড়ি গ্রামে সেও তাঁর গিটার কাঁধে মেঘলা দুপুরের গান গায় । তারা দেখে রাতের আকাশ, বৃষ্টি হলে ছাদে ঘুরে আসে । আর জোৎস্নার রাতে ফিরে যায় জঙ্গল । আমি এখনও নিজেকে খুঁজি । বইয়ের পাতায়, খবরের নৃশংসতায়, আর রাত জাগা ফোনে । হয়তো আমিও সেই মনটাই হতে চেয়েছিলাম যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে । যার নাম হারিয়ে গেছে হাওয়ায় ।

 

এই বর্ণবিদ্বেষের পৃথিবীতে... দারিদ্র, যন্ত্রণা, বেকারত্ব, আত্মহননের পৃথিবীতে... এই অসাম্য আর ক্ষমতার লড়াইয়ে দুটো ডানার প্রয়োজন ছিল । যে ডানা দুটো বৃষ্টির জলেও ভেজে না । যে পাখিরা উড়ে যায় ঘর ছেড়ে, ফিরে আসে আরও এক দুই তিন শতক পর । আর পুরাতন গানদের বন্ধু বানিয়ে প্রত্যেকের রূপকথার গল্প লেখে তারাই । রাজকুমারির জন্য দেড়শো বছরের পুরাতন গান নিয়ে হেঁটে বেড়ায় পথিক  প্রেমিক । বাঁশি বাজায় আপন মনে, কিন্তু তাঁদের দেখা হয় না । অথচ, নন্দিনী ও বিশু পাগলের মত তারাও চিরন্তন । হয়তো সেই রূপকথা এখনও লেখা বাকি । এখনও বৃষ্টি আসা বাকি আরও অনেক । এখনও জোনাকিদের ঘুমাতে যাওয়া বাকি । এখনও সব তারারা পড়েনি খসে ।

 

কিন্তু আমরাও স্বপ্ন দেখবই । আমরা বলবই--- ভাবো, যে পৃথিবীতে কোনও দেশ নেই । মাকে ছেড়ে থাকার দুঃখকে সঙ্গে নিয়ে থাকব, কারণ অনেক দুঃখ যা ভোলার মত দুঃখ নেই । কয়েকটা যন্ত্রণা আপন হয়, শীতের সেই দুঃস্বপ্ন়টাও সেই একইরকম । যাকে ভোলার জন্য এখনও বৃষ্টি হলেই শহর টানে, এখনও মেঘলা আকাশ উড়িয়ে আনে চিঠি । আমি একের পর এক নৌকা ভাসাই, ট্রলি ব্যাগ থেকে বের করে নিই মায়ের শাড়ি । জানি, ঘুম থেকে উঠেই দেখব মা ফিরে এসেছে আরও এক মেঘলা বিকেল হয়ে ... খসে গিয়েছে আরও একটা তারা ... টবের গাছে নতুন ফুল এসেছে পরবর্তী সকালে ...

Saturday, 23 May 2020

একটি ন্যূনতম ক্ষতি আখ্যান

আমফানের ল্যান্ডফল হওয়ার আগেরদিন সুন্দরবনের একটা খবর সম্পাদনা করেছিলাম। সংবাদের মূল লক্ষ্য ছিল, সিঁদুরে মেঘ দেখছে সুন্দরবন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে প্রতিমুহূর্তে অস্ত্বিত্বের জন্য লড়ছে। ঘোড়ামারাসহ সুন্দরবনে একাধিক দ্বীপ আছে যারা অস্তিত্ব সংকটে। একটুকু আঁকড়ে লড়ে যাচ্ছে নদীর পারের বসতিগুলো। আমফান আসার পর কী হয়েছে ভাবতে পারি না, যারা ইন্টারভিউতে কথা বলেছিল...যারা বলেছিল, "গরিব তাই জীবনের নিশ্চয়তা নেই!"... সেই মানুষগুলো এখন কোথায়? জানি না ৷ আমফানের আগের বাংলা এবং আমফান পরবর্তী বাংলা এক নয় ৷ বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা...হয়তো প্রায় ধ্বংসাবশেষ সুন্দরবন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, যেকোনও সংবাদমাধ্যমের কাছে সেই ধ্বংস, সেই যন্ত্রণা, সেই সর্বহারাদের গল্প গুরুত্ব পায় না। যতটা কলকাতা পায়।




আমরা দক্ষিণের শহরতলি৷ গতকাল বাইরে বেরিয়েছিলাম। দেখলাম ভেঙেচুরে পড়ে আছে আমার এই ছোটো শহরটা। কতক্ষণ বিদ্যুৎ পরিষেবা নেই, কতক্ষণ কাছের মানুষগুলোকে যোগাযোগ করতে পারিনি আর হিসেব থাকছিল না। এক একটা টিউবওয়েলে বড় লাইন। কারণ পানীয়জল নেই আমাদের। তখন কোথায় সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং কোথায় কী? ইতিমধ্যেই বাঁচার লড়াই শুরু হয়েছে। তখন ইত্যাদি অসুখ মাথায় আসে না...খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের বাইরে আসলে মানবসভ্যতা কিছু চায়নি। বাকি যা কিছু একটা মরীচিকার মত। গতকাল প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সংযোগ আংশিকভাবে ফিরেছে। এখনও মোবাইল ইন্টারনেট কোনওভাবে চলছে। অন্তত দুইদিনে একথা স্পষ্ট...সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে গেলেও বা দুটি ছবি শেয়ার করার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা প্রয়োজন। আসলে যারা পোস্ট করতে পারেনি বা পারছে না যাদের যোগাযোগ করা যায়নি এখনও তাদের কী পরিস্থিতি কিছু জানি না।

আমার শহরতলির এরকম অসহায় মুখ আমায় কখনও দেখতে হবে ভাবিনি। আমি এও ভাবিনি আমার জেলা এইভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। আমি কখনও ভাবিনি আমার য়ুনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের লাল কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো উপড়ে যাবে কিংবা ভেঙে যাবে লাইব্রেরির সামনের স্কাল্পচার। আমি ভাবিনি কলেজ স্ট্রিটের বইগুলো ডুবে যাবে এভাবেই। আমি কল্পনা করতে পারিনি কুমোরটুলির এখন অবস্থা কী? আমি জানি না আমার সেই বন্ধুরা কেমন আছে যাদের এখনও যোগাযোগ করতে পারিনি...



আমার এক বন্ধু আমায় গতকাল মেসেজে লিখে পাঠিয়েছিল,ওদের হাউসিং-এর সামনে একটা হলুদ রাধাচূড়া গাছ ছিল। হলুদ ফুলে বিছিয়ে থাকত চারধার। এখন সেখানে হলুদ রাধাচূড়ার মৃতদেহটাই আছে। আমিও কখনও ভাবিনি, ছোটো থেকে যে গাছটা দেখতে দেখতে বড় হয়েছি সেই গাছটাই ওভাবে ভেঙেচুরে রাস্তায় পড়ে থাকবে। যে রাস্তায় ছুটে ছুটে খেলে বেরিয়েছি সেই রাস্তার অংশ ভেঙে পড়ে থাকবে। আমি ভাবিনি। আমরা গাছেদের ভালবেসেছি, আমরা কলেজ স্ট্রিট ভালবেসেছি, বইয়ের গন্ধ ভালবেসেছি। আমরা ভালবেসেছি ক্যাম্পাস, শহরের প্রত্যেকটা গলি আর প্রত্যেকটা মানুষকে। না দেখা সুন্দরবনকেও ভালবেসেছি। তাই তো এত যন্ত্রণা হচ্ছে । কষ্ট হচ্ছে আমার বাংলার জন্য । পরিস্থিতি একটু সামলে নিয়ে 'পারেঞ্জার্স'-র পক্ষ থেকে খুব দ্রুত কাজ শুরু হবে। কারণ, আমরা প্রত্যেকে পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত।

আমার কেরলের সহকর্মী আমায় অনেকবার ফোন করেছে। মেসেজ এসেছে বিদেশের বন্ধুর থেকেও...জানতে চেয়ে আমরা কেমন আছি? বাংলা কেমন আছে? আবার অনেকেই বাঙালির উপর ঘেন্না থেকে পরিস্থিতিতে হেসেছে ৷

ফেসবুকে আমার বন্ধুরা অনেকেই শেয়ার করেছেন দেখলাম কয়েকটি স্ক্রিনশট। যেখানেই এই বিষয়টি দেখা গিয়েছে যে নির্দিষ্ট এক বলয়ের লোকজন বেশ খুশি। পশ্চিমবাংলার এই পরিণতিতে তারা বেশ খুশি। কেউ মনে করেন এটা শিবের রাগ, কেউ মনে করেন বাংলার পাপের কারণ। কেউ বলেছেন, "ন্যূনতম ক্ষতি!" এদের চিনে রাখা উচিত কি না জানি না, এদের মানুষ বলে মনে করি না। আর অমানুষ দেখতে মানুষের মতই। আমাদের অবাক লাগে কেন জানেন, কারণ বাংলার মানুষ এমনভাবে ভাবতে শেখেনি। বাংলা জানে, অন্যের জন্য লড়াই করতে...বাঙালি জানে অন্যের জন্য গর্জে উঠতে। কেরলের বন্যায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে দুবার ভাবে না। কিংবা উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে সংঘর্ষের সময় কলকাতার কয়েকজন ছেলেমেয়ে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল যখন? অন্য রাজ্যের কষ্টে চোখের জল ফেলেছিল বাঙালি। ভারতের যে নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্র অন্যায় করবে ভেবেছিল, তাদের হয়ে আওয়াজ উঠিয়েছিল বাঙালি। একসঙ্গে বলে উঠেছিল, "আমরা কাগজ দেখাব না!" এগুলো আমাদের শিখিয়ে দিতে হয়নি কোনওদিন। এগুলো আমরা এমনিই জানি। তাই অন্যের যন্ত্রণায় কোনওদিন হাসতে পারব না। অশিক্ষিতর মতো বলে দিতে পারব না, মিডিয়া কভারেজ পায়নি তাই এত চিৎকার করছে দেখে হাসি পাচ্ছে। উল্টে সেই রাজ্যটাই যদি কোনও ঘটনায় মিডিয়া কভারেজ না পায় আমরা প্রতিবাদের সুর তুলবই। আমাদের রক্তে বিপ্লব আছে, তা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন জানে। ৭০-এর বাংলাদেশ জানে, ভারতও জানে। তাই আমরা ঠিক উঠে দাঁড়াবই...হয়তো আজ না কিন্তু কয়েকদিন পরেই। সুন্দরবনের মানুষ হাসবে। কাকদ্বীপ, সাগরদ্বীপ আবার গড়ে নেবে নিজেকে। অসুখ ক্লান্ত জেলাগুলো ঠিক উঠে দাঁড়াবে ৷ আমার শহরতলির অসুখ ঠিক হবে। আবার ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল ফুটবে । বন্ধুর হাউসিংয়ের সামনে রাধাচূড়ার মৃতদেহ থেকেই জন্ম নেবে নতুন প্রাণ। কলেজস্ট্রিটের দোকানগুলোয় ভিড় হবে আবার। ধ্বংসস্তূপ থেকেই জেগে উঠবে বাংলা। হাসবে, আর হ্যাঁ এও জেনে রাখুন আপনার বিপদে পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। আমরা উঠে দাঁড়াতে জানি কারণ আমাদের মেরুদণ্ডটা গুঁড়িয়ে যায়নি যেমন সেই 'তাদের' অনেকদিন আগেই গেছে...




ছবি ফেসবুক থেকে নেওয়া। আমায় ক্ষমা করবেন, জানি না এই ছবি কার বা কাদের তোলা তাই ক্রেডিট দিতে পারলাম না।

Monday, 20 April 2020

যারা স্বপ্নমিছিলে হেঁটেছিল


হরে ল্যান্ড করল মিছরির ফ্লাইট । আজ প্রায় তিনবছর পর আবার শহরে ফেরা । ফ্লাইট মোড অফ করতেই হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ এল --- “Reached?” মিছরি উত্তর দিল, “just landed. I’ll call you.” এখনও কুয়াশার ঘুম কাটেনি কলকাতার । এয়ারপোর্টের অধিকাংশই আবছায়ায়বেশ শীত করছে । প্লেন থেকে নেমে লাগেজ বেল্টের কাছে এগিয়ে গেল । ফোনের নিউজ় অ্যাপটা খুলল । উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে দাঙ্গায় এখনও পর্যন্ত মৃত 40 । গত দুরাত এক ফোঁটাও ঘুম আসেনি । যতবার চোখ বন্ধ করেছে , ফিরে এসেছে আগুন । বাড়িগুলো জ্বলছে । সারিসারি মৃতদেহ পড়ে রয়েছে রাস্তায় । রাতে ঘুম না এলে আগে খুব একা লাগত । এখন ঘুম না এলে হোয়াটস অ্যাপ খুলে মেসেজ টাইপ করে --- জেগে আছিস?” ওইদিক থেকেও উত্তর আসে, ঘুম আসছে না ?”  মিছরি কখনও কারোর উপর নির্ভরশীল হতে চায়নি । তবে ইদানীং ওর মনে হয় কোনওভাবে কি ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে । 

পাঁচ বছর আগে কলকাতার এক ফিল্ম স্কুলে অ্যাডমিশনের ওরিয়েনটেশনে আলাপ হয়েছিল সৌভিকের সঙ্গে । ফিল্ম স্কুলের সেইবছরের মেরিট লিস্টে নাম আসেনি মিছরির । সৌভিকের অ্যাডমিশন হয়েছিল । এরপর মিছরি সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করে । একদিন ভোরের ট্রেনে শহর ছাড়ে । নিজের কাছেই প্রমিস করেছিল আর কোনওদিনও শহরে ফিরবে না ও । অথচ, এই কলকাতাই মিছরির বড় প্রিয় । প্রত্যেকটা রাস্তা, প্রত্যেকটা গাছ, ভিড় এসব কিছুই আপন । আর সবথেকে প্রিয় ছিল ওর য়ুনিভার্সিটির ক্যাম্পাস । ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটা কৃষ্ণচূড়া গাছ, সেন্ট্রাল লাইব্রেরির রিডিং রুম । 

লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হল মিছরি । নেহাকে ফোন করল কলার টিউনে বাজছে জন ডেনভারের একটা গান, কান্ট্রি রোড টেক মি হোম...টু দ্য প্লেস আই বিলং ।
--- হ্যাঁ বল সুপর্ণা 
--- নেহা আমি এয়ারপোর্ট থেকে বেরোলাম । কোন বাসে উঠব তোর বাড়ি আসার জন্য ?
--- এসি 37(এ) –এ ওঠ । দেখ এয়ারপোর্টের বাইরেই বাসস্ট্যান্ড । কাউকে জিজ্ঞেস কর ।
--- হ্যাঁ দেখতে পেয়েছি । ঠিক আছে রে, পাটুলিতে নেমে তোকে ফোন করছি ।

ফোন কেটে দিয়ে বাসে উঠল মিছরি । কিছুক্ষণ পর বাস ছাড়ল । তিন বছরে কী পাল্টিয়েছে শহরটায় ? দুইদিনের জন্য শহরে ফেরা, তারপর আবার যন্ত্রের মত জীবনযাপন । এই জীবনটাই কি চেয়েছিল মিছরি নাকি একটা পাখির মত হতে চেয়েছিল । স্বপ্ন দেখতেই ভালবাসত ভীষণ । এখন স্বপ্নগুলোকে চাইলেও ছুঁয়ে দেখতে পারে না । কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল কে জানে । ঘুম ভাঙল সৌভিকের ফোনে । 

--- হ্যাঁ বল সৌভিক ।
--- কোথায় তুই এখন ।
--- বাসে, এসআরএফটিআই-র সামনে । স্বপ্নের পৃথিবীর গেটের সামনে দিয়ে যাচ্ছি ।
--- তুই এখনও সেসব ভাবিস ?
--- কেন ভাবতে বারণ আছে না কি ?
---- আরে না না । তোর সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষা করছি ।
--- আমার জন্যেও কেউ অপেক্ষা করে তবে । মুম্বই থেকে হঠাৎ শহরে এলি কেন ? এই মাসে ছবির কাজ নেই ?
--- তুই এলি কেন ? বলব বলব ছবির কাজ কী আছে । খুব অপেক্ষা করছি সুপর্ণা ।
--- কথা তো ছিলই দেখা হবে । তাই এলাম । কাল দেখা হবে । আগামীকাল সন্ধেয় ফ্লাইট ।
--- সে কী ? আর থাকবি না ? একদিনের জন্য ?
--- এই শহরে বেশদিন থাকা আমার জন্য ভাল না সৌভিক । তোকে কথা দিয়েছিলাম তাই এলাম । চল রাখি । পাটুলি এসে গিয়েছি ।
--- পাটুলি কেন ? বাড়ি যাবি না ?
--- চল টাটা । 

বাস থেকে নামল মিছরি । নেহার থেকে ঠিকানা জেনে নিয়ে রাস্তা পার হল । নেহার এই নতুন ফ্ল্যাটটা বেশ সুন্দর । দরজা খুলেই মিছরিকে জড়িয়ে ধরল নেহা । মিছরির চোখেও জল এল  । 

 ২
ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ খেল নেহা ওর জন্য পছন্দের পদগুলো রান্না করেছিল । ভাত, ডাল, আলুপোস্ত, চিঙড়ি মাছ । অনেকদিন পর আজ কেউ যত্ন করে রান্না করেছে ওর জন্য । নেহা ওকে খুব ভালবাসে ৷ পৃথিবীতে মিছরিকে যদি কেউ সবচেয়ে বেশি বুঝে থাকে, সে নেহা মিছরি কিছু না বললেও ওর মন পড়ে ফেলতে পারে ৷ প্রিয় সিনেমা থেকে প্রিয় কবিতা সবেতেই ওদের ভীষণ মিল আর ওরা ভালবাসে স্বাধীনতা,  এক স্বাধীন জীবনযাপন       
দেশে এখন খুব কঠিন এক পরিস্থিতি সেই ডিসেম্বর মাস থেকে একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন আসার পরে দেশটা কেমন দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল ওরা তো ওটাই চেয়েছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষগুলোকে নিশ্চিহ্ন যদি করে দেওয়া যায় মিছরি জানে রা প্রশ্ন পছন্দ করে না, রা চায় অনুসরণ মানুষ অন্ধের মত অনুসরণ করবে আর এইদিকে মিছরির মত যারাই প্রশ্ন করতে চাইবে তাদের ডানা ভেঙে ফেলে দেওয়া হবে ৫ জানুয়ারি জেএনইউ ক্যাম্পাসে ঢুকে মেরে গেছে ওরা আর শাহিনবাগ...লড়ছে অস্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তি হয়ে লড়ছে অধিকারের জন্য লড়ছে মিছরিরাও পাশে আছে ওদের তবু মিছরির খুব ভয় হয় এখন...মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে যায় সেইদিনটার কথা ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে আসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের সপক্ষ ও বিপক্ষ ওরা লড়ছে মরছে মানুষ মৃতদেহ দেখলে মিছরির কান্না পায় ৷ যুদ্ধ শুনলে মিছরির কান্না পায় কাউকে বলতে পারে না স্মৃতি ওকে প্রতিদিন কাঁদায় এই শহর ওকে প্রতিদিন কাঁদায় মিছরি পালিয়ে বেড়ায়

 ৩
নেহার এই এক কামরার ফ্ল্যাটটা খুব সুন্দর নেহা মনের মত সাজিয়েছে সবথেকে সুন্দর ওর বারান্দাটা আলো জ্বলে ফুলগাছ রাখা মনে হয় রূপকথার কোনও এক পৃষ্ঠা পক্ষীরাজ নেমে আসবে এখনই, স্বপ্নের কাছে নিয়ে যাবে ওদের মনেই হয় না,  দেশের আর এক প্রান্তে মানুষ মানুষকে কাটছে এক উগ্র জাতীয়তাবাদ দেশটাকে একটু একটু করে গ্রাস করছে
ওলড মঙ্ক ওদের দুজনেরই খুব প্রিয় গ্লাসের ওলড মঙ্ক একটু একটু মত্ত করছে সন্ধেটা নেহার প্রিয় সুমন , ঘরে বাজছে তাঁর গান
" সুপর্ণা তুই কি কোনওদিনও বাড়ি ফিরবি না?", জিজ্ঞেস করল নেহা মিছরি মাথা নেড়ে না জানাল
---  কেমন কাটছে নতুন শহরে ? তিনবছরে একবারও আমার কথা ভাবলি না দেখা করতে এলি না । এখন কার একটা প্রেমে পড়ে চলে এলি হুম ?
---  প্রেম ? তুইও তাই বলবি নেহা ? তুই তো জানিস আমি কেন শহর ছেড়ে গিয়েছিলাম । আজ়িফ ছাড়া জীবনটা কখনও ভাবতে পারিনি তোর মনে আছে ও কী সুন্দর ছবি আঁকত
--- মনে আছে আমাদের য়ুনিভার্সিটির জীবনের প্রত্যেকটা সময় মনে আছে তোদের কথা মনে আছে  আমাদের স্বপ্নের কথা এখনও মনে পড়ে       
--- আমার কান্না পায় নেহা মনে হয় বাঁচব না মনে হয় একদিন আবার সব ঠিক হয়ে যাবে তাঁরা সবাই ফিরে আসবে যাঁরা হারিয়ে গিয়েছিল ।
কান্নায় ভেঙে পড়ল মিছরি নেহা ওকে জড়িয়ে ধরল মাথায় হাত বুলিয়ে দিল "এসব আর ভাবিস না সুপর্ণা আমরাও ভাবি না আর ওরা কেসটাকে পুরো অন্যভাবে সাজালো, র মা থানায় অভিযোগ করতে গেলে ওকে মারধর করে বাড়ি পাঠানো হল কোনও মিডিয়া কভারেজ হল না আমাদের বন্ধু! আমরা ভাবতেও পারি না মুক্ত পাখির মত একটা ছেলে সারাদিন তোর সঙ্গে...আর ভাবিস না সুপর্ণা! আমরা আছি একদিন সব ঠিক হবে দেখিস "
চোখের জল মুছে গ্লাসে রাম ঢেলে নিল মিছরি "ওর দোষ কী ছিল জানিস নেহা, ও প্রশ্ন করেছিল! আমার এদের ঘেন্না হয় করুণা হয়",  মিছরি বলল নেহা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল নেহার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল মিছরি
--- আমরাও কি মিছিলে হাঁটিনি নেহা ? আমরাও কি মানুষের জন্য ভাবিনি? আজ দেশটা কেমন দুভাগে ভাগ হয়ে গেল মৃত্যুতে আমার ভয় লাগে ওঁর কথা মনে পড়ে

বৃষ্টি এল হঠাৎ জলের ছাঁট এসে লাগছিল মিছরির চোখেমুখে চোখ বন্ধ করে ও দেখতে পাচ্ছিল ক্যাম্পাসের মাঠ সেদিনই থার্ড সেমেস্টার শেষ হয়েছে রা দুজন বসে আছে সেইদিন আকাশে অনেক তারা একটুও মেঘ নেই । কাল বাড়ি ফিরে যাবে আজ়িফ । মিছরির হাত ধরে বলল, " শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা,  তিন মাস ঘুমিয়ে থাকব!"  মিছরি কে ধাক্কা দিয়ে বলল, এসব বলে নাটক করিস না মিছরির কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল বলল, "এই যে এইখানে তো ! কয়েকটা দিন আমার বাড়িতে সময় দেওয়া প্রয়োজন । হস্টেলেও আর ভাল লাগছে না । এখনও রাগ করবি ?  চলে আসব দেখিস দুই সপ্তাহ পরেই ।" মিছরি ওর মাথায় হাত রাখল । ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল, তিন সত্যি ?  খুব বেশিদিন আমি তোকে না দেখে থাকতে পারি না তুই জানিস । তাড়াতাড়ি আসবি কথা দে । তুই ছাড়া ক্যাম্পাস আমি ভাবতেও পারি না । ও মিছরির হাত ধরে বলল, কথা দিলাম বাবা । এবার একটা গান শোনা । মিছরি গাইতে শুরু করল, আভি না যাও ছোড়কার...কে দিল আভি ভরা নেহি... হঠাৎই আজ়িফের হস্টেলের বন্ধুরা এল । ওদের মধ্যে থেকেই একজন বলল, তুই এখানে প্রেম করছিস ? ওইদিকে ওরা তোকে খুঁজছে । হস্টেলে দলিত পরিবারের নতুন যে ছেলেটি এসেছে, ওর থাকা নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে । এখনই চল । মিছরির কোল থেকে মাথা তুলে নিল ও । উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল । মিছরির দিকে হাত নেড়ে বলল, আসি এখন । পরে দেখা হবে । তুই সাবধানে চলে যাস । এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে চলে গেল । ঘুরেও তাকাল না । মিছরি জানত, ওর সহপাঠী ওর সংগঠনের এই ছেলেটি ক্যাম্পাসে মিছরির পরিচিতি একটু একটু করে কমিয়ে ফেলছে । কখনও ভাল প্রেমিক হতে পারেনি । তাও ওকেই খুব ভালবাসে মিছরি । সেইদিন ফাঁকা মাঠে একা দাঁড়িয়েছিল । ঝাপসা হয়ে এসেছিল ক্যাম্পাস । চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল । চোখ খুলে বাইরে তাকাল মিছরি তখনও বৃষ্টি পড়ছে । নেহার বারান্দার আলো জ্বলছে নিভছে । মিছরির কান্না এল, এই শহর ওর থেকে নিয়েছে, ফিরিয়ে দেয়নি কিছু
---  নেহা তোর সৌভিককে মনে পড়ে ? শিলিগুড়ির ছেলেটা ফিল্ম স্কুলে আলাপ হয়েছিল ওর সঙ্গেই কাল দেখা করব!
--- হ্যাঁবলেছিলি, মনে পড়ে অল্প বেশ তবে দেখা কর ভাল তো আমরাও চাই এখন খেয়ে নিবি চল... 


চাঁদনি মেট্রোর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে মিছরি অল্প বৃষ্টি পড়ছে ও চেষ্টা করছে বৃষ্টির জল এড়িয়ে যেতে সৌভিককে ফোন করছে,  সে ধরছে না একটা ক্যাব সামনে এসে দাঁড়াল সৌভিক নামল মিছরির কাছে এগিয়ে এল বলল, "আরে বলিস না! শেয়ারড ক্যাব তো দেরি হয়ে গেল চল রাস্তা পার হই!" মিছরি তাকিয়ে হাসল দুজনে ব্রডওয়েতে ঢুকল রাস্তার দিকে জানলার পাশে একটা টেবিলে বসল পাঁচ বছর পর ওদের দেখা একটু অপ্রস্তুত বোধ করছিল আইসব্রেক করল সৌভিকই
---  বল সাংবাদিকতা কেমন চলছে?
---  তোর ছবি বানানো কেমন চলছে বল আগে!   
---  ছবি কই বানাচ্ছি,  ডিরেকশন টিমে কাজ করছি আর কী! নিজের পরিচিতি তৈরি করব কীভাবে তাই ভাবছি বিয়ার খাবি?
---  ঠান্ডায়?
--- বল না,  খাবি? সারাক্ষণ রাম খেতে হবে না ঠান্ডা লাগলে ডাক্তার দেখানোর দায়িত্ব আমার
মিছরি হাসল সৌভিক দুটো বিয়ার অর্ডার দিল আর ড্রাই চিলিচিকেন" আমার সাংবাদিকতা ঐ চলছে খবর সম্পাদনা করছি, সেরকম থ্রিল কই ! তুই বল কী বলছিলি !"
--- হ্যাঁ এই ফিল্ডে নিজের পরিচিতি তৈরি করাটা খুব প্রয়োজন ইন্ডাস্ট্রিতে সার্ভাইভ করতে হবে তো
--- হুম বুঝছি তো প্ল্যান কী তোর!
--- এই যে একটা আবছা আলো তোর মুখ এসে পড়ছে, এই আলোয় তোর একটা ছবি তুলব       

মিছরি হাসল বৃষ্টি এল আবার জানলার কাচের ওপাশে ভিজে যাওয়া শহরটা কী অন্যরকম লাগে মিছরি আবার ফোনের নিউজ অ্যাপ খুলল দিল্লিতে একের পর এক বাড়ছে মৃতের সংখ্যা মাঝেমধ্যে কেমন জানি অবশ লাগে ওর মনে হয়, এই জীবন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলে ভাল হত এই পৃথিবী ওদের মত মানুষের জন্য নয় "ফেসবুকে ভাইরাল ওই ভিডিয়োটা দেখেছিস? ওই যে মানুষের বুকের উপর পা তুলে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানো হচ্ছে?", প্রশ্ন করল সৌভিকমিছরি মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল" এইসব দেখলে এত রাগ হয়, মনে হয় সব তছনছ করে দিই! এই শাসন চাই না! ", সৌভিক জোরে বলে উঠল
মিছরি শান্তভাবে সৌভিকের দিকে তাকাল বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিল " নাইট অ্যান্ড ফগ" ছবিটার কথা মনে পড়ে?", প্রশ্ন করল মিছরি
--- মনে পড়ে কী, ছবিটা সঙ্গে নিয়ে বাঁচি ৷ ছবিটা সবসময় অন্যায়ের কথাগুলো মনে করিয়ে দেয় এই পৃথিবীতেই সেই সময়, অথচ কত দূরে
--- আমি যেইদিন প্রথম নাইট অ্যান্ড ফগ দেখি, আমি ঘুমাতে পারিনি কী অদ্ভুত সময়রেখা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের এক একটা অংশ আমরা দেখছি, যা বর্তমান ভয়েস ওভারে অতীতের কথা শুনছি গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুর যন্ত্রণা অনুভব করতে পারছি কত মানুষ অসহায়ভাবে মারা গিয়েছেন আর যখন অতীতের ছবি দেখছি, ভয়েস ওভারে তা ঘটমান বর্তমান হয়ে ওঠে মনে হয়, সেই অত্যাচারিত মানুষগুলো আমাদের দিকেই আসছে আঙুল তুলছে পৃথিবীর দিকে, অন্যায়ের দিকে কেন পৃথিবী চুপ করেছিল? কেন রুখে দাঁড়ায়নি?
--- আমার তো সবচেয়ে কষ্ট হয় ওই লোহার তারের ব্যারিকেডের দৃশ্যটা ভাবলে শুধু বন্দুক চালানো অভ্যেস করার জন্য মানুষগুলোকে বলা হত যাও তোমরা চলে যাও...পালিয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হত...সেই লোহার তারের ব্যারিকেডে আটকে থাকত মৃতদেহ কী নির্মম! পৃথিবী তো এখনও চুপ করে আছে পৃথিবী রুখে দাঁড়াতে জানে না অসমে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে অবৈধ নাগরিকদের সেখানে নিয়ে গিয়ে রাখা হবে বা যারা নাকি ভারতের নাগরিক নয় তারা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাবে! মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ মানুষ তাই তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে
--- ওরা আসলে ভুলে যায় রাষ্ট্র কারোর ভার বহন করে না শ্রমের এই সিস্টেমে শ্রম দিলে খাবার আসে কেউ কারোর গ্রাস কেড়ে খায় না যারা এক দেশ থেকে সব ছেড়ে চলে এসেছেন, যারা বছরের পর বছর শ্রম দিয়েছেন রাষ্ট্র তাদের শ্রম ভোগ করেছে আজ তাদের নাগরিকত্বে প্রশ্ন তুলে তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠাতে চায় আমার এদের উপর করুণা হয়
---  কেন তোদের য়ুনিভার্সিটির ওই ছেলেটার কথাই বল, রুমি নামের ছেলেটা! পুরো নামটা বোধ হয়  আজ়িফ রুমি । ওকে কী করল? মিডিয়া কীভাবে সাজাল ওর কেসটা? ছিঃ!
মিছরি চমকে গিয়ে সৌভিকের দিকে তাকাল মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকল বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে "কী হল সুপর্না?" মিছরি নীরব বসে রইল এই শহর তবে রুমিকে মনে রেখেছে আজ তিনবছর পরেও সবাই তবে রুমিকে ভুলে যায়নি এখনও মানুষ ভাবছে যে সেদিন অন্যায় হয়েছিল মিছরির হাতের উপর হাত রাখল সৌভিক মিছরি শক্ত করে চেপে ধরল সৌভিকের হাত ওর চোখ থেকে জল পড়ছিল আজ মনে হল, না ওরা কজনই না এখনও শহরের অনেকেই রুমিকে মনে রেখেছে রুমি ছাড়া জীবনটা কখনও ভাবতে পারনি মিছরি রুমির হারিয়ে যাওয়ার পর পাশে দাঁড়ায়নি পরিবার, মিডিয়ার সামনে কথা বলতে দেয়নি । তাঁদের কাছে ফিরব? বারবার নিজেকে একই প্রশ্ন করেছে এই তিন বছরে । মিছরির মনে হল আর বাঁচবে না । যদিও ও এখনও বিশ্বাস করে রুমি আবার ফিরে আসবে
ক্যাম্পাসে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা সংখ্যায় বাড়ছিল ওদের বাইরে থেকেও সমর্থন ছিল মিছরিরাোঝেনি রুমি সবার প্রিয় ছিল মিছরি কোনওদিন ভাবনি, ওর কী ধর্ম রা তো মানবধর্মে বিশ্বাসী শুধু ভালবেসেছিল রুমিও বোঝেনি ওর শত্রু তৈরি হয়েছিল সেইদিনও বলেছিল, কদিনের জন্য বাড়ি ফিরে যাবে একদিন বিকেলে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে অটোয় উঠলহাত নেড়ে বলল, আবার দেখা হবে ! মিছরিও মাথা নাড়ল পরে জেনেছিল, হস্টেলে ঝামেলা হয়েছেওইদিক থেকে হুমকি এসেছে মিছরি কিছু বুঝতে পারেনি । রুমি এত ভাল ছেলে, ওর শত্রু থাকতে পারে পরে বুঝেছে, ধর্ম রুমিকে শত্রু বানিয়েছে আসলে ধর্ম না, ওরা রুমিকে রুমির মত অনেককেই শত্রু প্রমাণ করতে চাইছে মিছরি কখনও ভাবনি আর কোনওদিনও রুমিকে দেখতে পাব না দুইদির রুমির ফোন বন্ধ । বাড়িও ফেরেনি । হারিয়ে গিয়েছে রুমি । যোগাযোগ করা যাচ্ছে না । ওরা প্রতিবাদ করেছিল । সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করেছিল । মিছিলে হেঁটেছিল । 12 দিন অনশনের পর অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে ভরতি হয়েছিল । বাড়ি ফেরার পর দেখল সব পাল্টে গিয়েছে । ওরা কেসটাকে পুরো অন্যভাবে সাজিয়েছে । রুমির মা থানায় অভিযোগ করতে গেলে ওকে মারধর করে বাড়ি পাঠানো হয়েছে এফআইআর দায়ের হয়নি । এই ঘটনার কোনও মিডিয়া কভারেজ হয়নি উল্টে প্রশাসন দাবি করেছে, রুমি সমাজবিরোধী কাজে যুক্ত তাই গা ঢাকা দিয়েছে কাল নেহা বলেছিল, একদিন রুমি ঠিক ফিরবে দেখিস

নিস্তব্ধতা ভাঙল সৌভিক । বলল, তোর সঙ্গে কথা বলতে খুব ভাল লাগে সুপর্ণা ৷ রাতে তোর মেসেজের অপেক্ষা করি যেবার সেই ওরিয়েনটেশনে দেখা হল, তখন ভাবিনি যে আবার তোর সঙ্গে দেখা হবে তোকে খুব ভাল লেগেছিল কিন্তু মনে হত, তুই সেই স্বপ্নটা যাকে ছোঁয়া যায় না শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা আসার পর তুইই প্রথম মানুষটা যাকে সবচেয়ে ভাল লেগেছিল আবার চলে যাবি মিছরি?
---  তুই আমার ডাকনাম কীভাবে জানলি?
---  আমি জানি বল না, পাশে থাকবি আমার ? আমি জানি তুই আমার জন্য শহরে এসেছিস কিন্ত আমি অন্য একটা কারণে শহরে এসেছি তোদের সাহায্য প্রয়োজন থাকবি আমার পাশে?
---  কী কারণ? কী সাহায্য শুনি সেরকম হলে নিশ্চয়ই থাকব
---  তোদের য়ুনিভার্সিটির ছেলেটা রুমি, জানিস নিশ্চয়ই তোরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছিস সবাই জানত, তুই রুমি আরও অনেকেই খুব ভাল বন্ধু ছিলি মানুষের পাশে থাকার জন্য রুমি সেসময় বারবার খবরে আসছিল মাঝেমধ্যে তুইও আসছিলি তোর মনে আছ তো রুমির কথা

মিছরি অবাক হয়ে সৌভিকের দিকে তাকাল রুমিকে ভুলে যাবে ও? ওর জীবন ছিল রুমি কীভাবে ভুলে যাবে !  সৌভিক আবার বলল, "রুমির হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক বিদ্বেষ,  ওর মায়ের উপর পুলিশের অত্যাচার এসব আমরা জানি মিডিয়ার মিথ্যে প্রচার আমরা ভুলে যাইনি এই শহর রুমিকে ভুলে যায়নি আমরা জানি ও কোনও সমাজবিরোধী কাজে যুক্ত থাকতে পারে না আর রুমিরা হারিয়ে যায় না ঠিক ফিরে আসে যা মানুষের সামনে আসেনি, আমি সেই ছবিই মানুষের সামনে নিয়ে আসতে চাই সুপর্ণা আমি এই পুরো ঘটনাটার উপর একটা ডকুমেন্টরি ফিল্ম করতে চাই রুমির মা, তোদের সবার ইন্টারভিউ আমার প্রয়োজন"
মিছরি চুপ করে আছেসৌভিক আবার প্রশ্ন করল, "বল না পারব না আমি? থাকবি না তুই পাশে? "   মিছরি চুপ করে থাকল ও কোনওদিন ভাবেনি, রুমির কথা আবার শহর মনে করবে কখনও ভাবেনি, মানুষের সামনে সত্যি আবার আসতে পারে সৌভিক ঠিক বলেছে,  রুমিরা কখনও হারিয়ে যায় না ওরা ফিরে আসবেই
--- আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে আসছে সৌভিকবের হই না কি?
--- চলে যাবি? থেকে যা না!
--- বললাম না,  এই শহরে বেশিদিন আমি থাকতে পারি না আমার দমবন্ধ লাগে তুই ছবির কাজ কবে থেকে শুরু করবি ?
--- পরের মাস থেকে এই মাসে প্রি-প্রোডাকশনের কিছু কাজ রয়েছে ফান্ড জোগাড় করা, স্ক্রিপ্ট লেখা ইত্যাদি কাজগুলো সেরে ফেলতে হবে তুই পাশে না থাকলে এই ছবিটা করার ভরসা পাচ্ছি না রে!
---  ফান্ডিং-র ব্যাপারটা তুই দেখ, আমিও দেখছি বের হই রে দেরি হয়ে যাচ্ছে

দুইজন ব্রডওয়ে থেকে বের হল ক্যাব বুক করল মিছরি "আমি যাই সঙ্গে? ", জিজ্ঞেস করল সৌভিক   মিছরি মাথা নেড়ে না জানাল ক্যাব এসে গেল মিছরি উঠে পড়ল ক্যাবে হাত নেড়ে সৌভিককে বাই জানাল "ফোন করিস পৌঁছে আর শোন, আগের থেকে অনেক বেশি সুন্দর হয়েছিস! মিস করব! দেখা হবে!" গাড়ির কাচ উঠিয়ে দিল মিছরি । 
কদিনের জন্য শহরে আসা হোয়াটসঅ্যাপ খুলে নেহাকে মেসেজে লিখল, 'যাই রেদেখা হবে আবার '  রুমি বলত, তুই আমায় ছেড়ে যেতেই পারিস আমি তোকে ছেড়ে যাব না তুই বিদেশে পড়তে যা, শহরে ফিরলে তোকে আমাতেই  ফিরতে হবে সেই বছর এমএ শেষ করার পর বিদেশে পিএইচডি করার সুযোগটা ছেড়ে দিয়েছিল মিছরি মনে হয়েছিল, আর এইসব চায় না জীবন, পৃথিবী, স্বপ্ন মুহূর্তের মধ্যে মিথ্যে হয়ে গিয়েছিল রুমির স্বপ্ন, ওর স্বপ্ন, ওদের সবার স্বপ্ন ছিল প্রত্যেকটা মানুষ ভালভাবে বাঁচুক, সমান অধিকারে বাঁচুক ওদের সেই স্বপ্ন সময়ের সঙ্গেই হারিয়ে গেছে এখন তো নিঃশ্বাস নিতেও ভয় হয় কিন্তু এই ভয় নিয়ে কতদিন আর বেঁচে থাকা যায়? মুখ খুললে জীবন যেতে পারে, যাবে !  রুমি ফিরে আসবে না, কিন্তু অন্যান্য রুমিরা সাহসের সঙ্গে বেঁচে থাকবে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে সৌভিককে মেসেজে লিখল, "থ্যাংক ইউ! আমি সবরকমভাবে তোর পাশে আছিরুমির জন্য আমরা লড়বআমি পালাব না পরের মাসে আসছি । ইন্টারভিউ দেব ।" উত্তর এল, "জানি" ক্যাব থেকে নেমে এয়ারপোর্টে ডমেস্টিক এন্ট্রান্সের দিকে এগিয়ে গেল মিছরি হঠাৎ মনে হল কেউ ডাকছে পিছনে ঘুরে তাকাল, রুমি দাঁড়িয়ে! সেইদিন অটোয় ওঠার সময় যে পাঞ্জাবিটা পরে ছিল, সেই পাঞ্জাবিটাই পরে রয়েছে হাত নেড়ে বলল, আবার দেখা হবে...