HAPPY READING...


Tuesday, 28 July 2020

কোভিড সংক্রমণ ও অস্পৃশ্যতা : বর্বরতার সভ্যতা


আমরা কি অমানুষ হয়ে যাচ্ছি না কি ছিলাম ?

 


কোভিড-19 এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আমাদের । এই সময়ে কি আমরা আরও স্বার্থপর হয়ে উঠেছি না কি আমরা স্বার্থপরই ছিলাম ?  কোভিড শুধু আমাদের মুখোশের অন্তরালটিকে সর্বসম্মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে ?  আমি জানি না, ভাবতেও পারি না । অস্পৃশ্যতাহীন সমাজের স্বপ্ন দেখা যখনই শুরু করেছি, তার আগেই অস্পৃশ্যতা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে । সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা সেই সত্যিকেই আরও স্পষ্ট করেছে । আর না, আমি অন্তত এইরকম একটা সমাজ চাইনি । বনগাঁর সরকারি হাসপাতালের যে ভিডিয়োটি প্রকাশ্য এসেছে, সেই ভিডিয়োটির কথা ভাবি । কী দেখলাম ? একটা মৃত্যু, যন্ত্রণা না কি বর্বরতা ? একটা যন্ত্রণাময় ভিডিয়ো, যা মানবসভ্যতাকে, মানবতাকে, মানবিকতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে । আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে, না আপনি মানুষ নন । হতে পারেন না । আপনিও এক স্বার্থপর যন্ত্রাংশ হয়ে উঠেছেন বা আগেই ছিলেন ।


শনিবার কোরোনার উপসর্গ নিয়ে বনগাঁ হাসপাতালে ভরতি হয়েছিলেন বনগাঁর বাসিন্দা মাধবনারায়ণ দত্ত । শরীরে কোরোনার উপসর্গ ছিল । ছিল শ্বাসকষ্ট । সেখানেই অবস্থার অবনতি হয় তাঁর । কোরোনা সন্দেহজনক হিসেবে তাঁকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ । একটা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও হয়েছিল, শুধু ছিল না সাহায্যের হাত । ওই হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ড থেকে বৃদ্ধকে বের করে এনেছিলেন তাঁর স্ত্রী । অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর প্রয়োজন ছিল, আশপাশের লোকজনকে ডাকছিলেন বারবার । বলছিলেন, দাদা আপনি তো মাস্ক পরে আছেন, আসুন না । একটু ধরুন না । অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিন না । না কেউ এগিয়ে আসেননি, সংক্রমণের ভয় ছিল যে... ততক্ষণে সেই হাসপাতাল চত্বরে আর যেই থাক, এককোণে দাঁড়িয়ে হেসেছিল স্বার্থপরতা আর সেখানেই মৃত্যু হয়েছিল মানুষের । না ওই বৃদ্ধের কথা লিখছি না । বৃদ্ধের শরীরের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু যে কয়েকজন মানুষ সেখানে ছিলেন তাঁদের অন্তরআত্মার মৃত্যু হয়েছিল সেখানে । বৃদ্ধ মাটিতে পড়ে যান, হয়তো প্রাণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন...তাঁর স্ত্রী তাঁকে নিয়ে কাকতি মিনতি করতে থাকেন । কিন্তু এগিয়ে আসেন না কেউ । এমনকি অ্যাম্বুলেন্স চালক, যিনি না কি পিপিই কিট পরেছিলেন...তিনিও এগিয়ে আসেননি । মাধববাবুর স্ত্রী তাঁকেও অনুরোধ করেছিলেন । বলেছিলেন, আপনি তো পিপিই পরে আছেন । একটু এগিয়ে আসুন না । বৃদ্ধের প্রয়োজন ছিল অক্সিজেনের । কারণ সেইসময় তাঁর শ্বাসযন্ত্র প্রায় বিকল । আমি জানি অক্সিজেন না পাওয়ার যন্ত্রণা কেমন হয় । আমি জানি, বাতাসে অনেক অক্সিজেন রয়েছে, কিন্তু তুমি নিতে পারবে না...সেই অনুভূতি ঠিক কেমন হয় ! আমি এও জানি, কাছের মানুষকে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতড়াতে দেখলে কী অনুভব হয় !

যাকগে, বৃদ্ধের বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা, তাঁর স্ত্রীর কাকতি মিনতি...এইরকম কতক্ষণ ঠিক চলেছিল?  আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে একটা মানুষ একটু জীবনের জন্য কাতড়াচ্ছিলেন আর আমরা এই যাদের অনেকটা মানুষের মতোই দেখতে তারা পাশ কাটিয়েছিলাম, সংক্রমণের ভয়ে! অ্যাম্বুলেন্সে টেনে হিঁচড়ে ওঠানোর চেষ্টা করেছিলেন মাধববাবুর স্ত্রীই । কিন্তু শেষরক্ষা হযনি, ওইখানে পড়ে যান বৃদ্ধ । মারা যান । তখনও তাঁর স্ত্রী বলে যাচ্ছেন, দাদা ট্রে টা একটু নামান না !  আশপাশের ব্যক্তিরা বলেছিলেন, "কাকা উঠে পড়ুন, উঠতে পারলেই বেঁচে যাবেন!" না আর বাঁচা হয়নি তাঁর । উঠতে পারেননি তিনি ।


আসলে আমরাই বুঝিনি । সংক্রমণ ছড়িয়ে গিয়েছে । যে ভয় আমাদের স্বার্থপরতার শিকলে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, সেই ভয় কী তা বুঝে ওঠার আগেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে । বর্বরতার সংক্রমণ, অমানবিকতার সংক্রমণ । আর আমরা সবাই সংক্রমিত ।

এই সমাজের কোশে কোশে শ্রেণিবিভাজন রয়েছে, বৈষম্য রয়েছে । না আমি এখানে মার্কসবাদী কোনও তত্ত্ব নিয়ে বড় বড় কথা লিখছি না । আমি লিখছি, সপাট সত্যির কথা । প্রতিবছর যক্ষ্মায় কত মানুষ মারা যান তার হিসেব আমরা রাখিনি, কারণ যক্ষ্মা অধিকংশক্ষেত্রেই সেই নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । আমরা ভেবে দেখিনি । কারও রক্ত উঠছে শুনলে নাক সিঁটকেছি । জরাজীর্ণ কঙ্কালসার চেহারা দেখে আঁতকে উঠেছি, তাও আমাদের খারাপ লাগেনি । কিন্তু কোভিড কাউকে ছাড়েনি । জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ নির্বিশেষে হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছে । বহুতল আবাসনের প্রত্যেকে আক্রান্ত হয়েছেন, প্রিভিলেজড শ্রেণিটির সাজানো সুন্দর অন্দরে অসুখ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে । আর তাই আমাদের টনক নড়েছে । আমাদের মধ্যে লুকিয়ে রাখা বিবর নিজেকে গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তখন । এই যে অস্পৃশ্যতায় মেতেছে মানুষ, সামাজিক দূরত্ব-র নামে অমানবিকতার খোড়াক পুষেছে, এই অস্পৃশ্যতা নতুন নয় । এর শিকড় অনেক গভীর, শুধু ভিন্ন নামে প্রকাশ্যে এসেছে । ভারত সেই দেশটাই, যেখানে কলার টিউনে বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়, রোগের সঙ্গে লড়ুন, রোগীর সঙ্গে নয় । ওঁদের সঙ্গে ভেদাভেদ করবেন না । হ্যাঁ ঠিক, এটাই আমার দেশ । এটাই আমরা । একটা বর্বর, কুৎসিত মুখ । আমাদের সামনে মানুষের মৃত্যু দেখলেও আমরা এগিয়ে যাব না, সাহায্যের একটা হাত বাড়িয়ে দেব না । কারণ আমাদের মৃত্যু ভয় আছে, সংক্রমণ ভয় আছে । আসলে আমাদের একটাই অসুখ আছে, স্বার্থপরতা! এর বাইরে আমরা বের হতে পারিনি । তাই মানুষের কান্নায় পাশে দাঁড়াতে পারিনি, মৃত্যুতে বন্ধু হতে পারিনি । বাঁচার আশা জোগাতে পারিনি । কারণ আমরা বাঁচতে চেয়েছিলাম । এই সমাজ বিশ্বাসঘাতক, আমরা প্রত্যেকেই এক একজন বিশ্বাসঘাতক । যাঁরা যুগের পর যুগ বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছি, নীতাদের সঙ্গে । আমরা তাঁদের বাঁচতে দিইনি, কারণ আমরা নিজেরা বাঁচতে চেয়েছিলাম । মেঘে ঢাকা তারার শেষ দৃশ্য আমাদের বিশ্বাসঘাতক চেহারাটিকে প্রকাশ্যে এনেছিল । আসলে আমরা জানি না, স্বার্থপরতা, শ্রেণিবিভেদ, লিঙ্গবৈষম্য, বর্বরতা, অস্পৃশ্যতা আমাদের শরীরে ছড়িয়েছে । প্রত্যেকের মৃত্যু হয়েছে, যাঁরা ঘুরছি তাঁরা লাশ । এক একটি নরখাদক লাশ ... আমরা প্রত্যেকেই এই পাপের ভাগীদার!

Thursday, 25 June 2020

বুলবুল : এক ডিসটোপিয়ান রূপকথা এবং নারীবাদ



বুলবুল ছবি মূলত যে আখ্যান নির্ভর, সেই গল্পটা আমাদের সবার জানা । সেই গল্পটা আমাদের ঠাকুমা বা দিদিমারা করে থাকেন । এক গ্রামে এক ডাইনির গল্প... একটা রূপকথা, কিংবা একটা ডিসটোপিয়া । একটি চরিত্র নির্ভর গল্প, যে চরিত্রটি গল্পের অন্ধকার অংশগুলো আরও অনেক বেশি স্পষ্ট করে তোলে । এখন বিষয়টি হচ্ছে, দৃষ্টিকোণ বা পার্সপেক্টিভ । বুলবুল হয়তো সেই পার্সেপেক্টিভ নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করতে চেয়েছে । একটা ডাইনি যার দুটো ডানা রয়েছে, বা একটা পরী যার পায়ের পাতা উল্টো ... আমরা কোন নারীর গল্প পড়ছি ?




এই ছবির আখ্যান পরিকাঠামোয় সময় একটা বড় চরিত্র পালন করে । কখনও 1881 সালে ফিরে যাই আমরা, কখনও তার 20 বছর পরের সময় দেখি আবার এরই মধ্যে পাঁচবছর পূর্ববর্তী সময়ে বর্বরতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে । এই সময়রেখা বুলবুলের(ছবির প্রধান চরিত্র, তার নামেই ছবির নাম) স্মৃতি । বারবার নৃশংসতার সেই অতীতকে ফিরে দেখে সে ।


1881 সাল । অবিভক্ত বাংলা । বুলবুলের বিয়ে হয় এক ঠাকুর পরিবারে । তখন তার বয়স খুব বেশি হলে দশ বছর হবে । অন্যদিকে তার স্বামী তার থেকে অনেক বড় । বুলবুল বুঝতেও পারে না, তার সঙ্গে কী হচ্ছে । বুলবুল বুঝতে পারে না তার স্বামী কে ?  তারই বয়সী তার ছোটো দেওরকে সে তার বর ভেবে বসে । এরপর সময় এগোয়... উচ্চবিত্ত ঠাকুরবাড়ির পিতৃতান্ত্রিক অন্দরমহল একটু একটু করে বেঁধে ফেলে বুলবুলকে । মনে করিয়ে দেয় তার বিয়ের সন্ধ্যার কথা... যখন তার পিসি তার পায়ের আঙুলে গহনা পরানোর সময় বলেছিল, এটা পরানো হয় স্নায়ু নিয়ন্ত্রণের জন্য, যাতে পাখি উড়ে না যায় ছোট্টো বুলবুলও জিজ্ঞাসা করে, পিসিমা নিয়ন্ত্রণ করা কী ? কারণ পাখির মতো একটা প্রাণ তখন জানেও না   উচ্চবংশীয় হিন্দু পরিবারের অন্দরমহলের দেওয়ালে কটা অদৃশ্য লোহার শিকল বাঁধা আছে । 
ছোটো বয়সে বুলবুলের অভিনয়ে রুচি মহাজন

বুলবুলের চরিত্রে তৃপ্তি দিমরি


অন্দরমহল নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে অন্য একটি ছবির প্রসঙ্গে লিখতে খুব ইচ্ছে করছে । অন্দরমহলের নিপীড়ণ, বাঁধন, যন্ত্রণা, অত্যাচার তো কখনও পরিবর্তন হয় না । আখ্যান বিশেষে সময় ও পরিসর পাল্টে নেয় কেবল । ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্তরমহল আমাদের এক জমিদার বাড়ির ঐতিহ্যের আড়াল করা বর্বর পিতৃতন্ত্রের চেহারা দেখিয়েছে । আমরাও দেখেছি, কীভাবে নিজ স্বার্থে পর্দার আড়ালে রাখা গৃহিনীকে ব্যবহার করে এসেছে একটা পরিবার । পিতৃতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদ আমাদের পূর্ব পরিচিত । কীভাবে প্রতি মুহূর্তে হিন্দু সমাজ একজন মেয়ের যৌনতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, কী কী বর্বর, কুৎসিত পদক্ষেপ করেছে তার একাধিক দৃষ্টান্তর সঙ্গে পরিচিত আমরা । অনভিতা দত্তর বুলবুল সেই অন্দরমহলের পরিসরকেই আবার দৃশ্যায়িত করে । একটা রূপকথার আড়ালে লেখে নারীবাদী উপকথা ।


ইন্দ্রনীলের(অভিনয়ে রাহুল বোস, যিনি ছবিতে দুইটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন) সঙ্গে বিয়ে হলেও আসলে দেওর সত্যকেই (অভিনয়ে অবিনাশ তিওয়ারি)ভালবেসেছিল বুলবুল(অভিনয়ে তৃপ্তি দিমরি) । যে তাকে সেই ভয়ের গল্প শোনাত, এক ডাইনির গল্প শোনাত । সত্যর সঙ্গে দিনযাপন, একসঙ্গে বেড়ে ওঠাকে বুলবুল অজান্তেই জীবন বানিয়ে নেয় । এরপর একদিন বিচ্ছেদ আসে । এই বিচ্ছেদ আমাদের পূর্বপরিচিত । বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা বিরহ এই বিচ্ছেদ যন্ত্রণা আমাদের অনেক আগেই অনুভব করতে শিখিয়েছে । কারণ ছবির সঙ্গীত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের গল্প বলে । সত্যর প্রতি বুলবুলের অনুভূতির কথা জানতে পেরে, সত্যকে বিলেতে পড়তে পাঠিয়ে দেয় ইন্দ্রনীল । আর বুলবুল সদ্য খসে পড়া তারার ভাঙা টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিতে থাকে । পুড়িয়ে ফেলে ভালবাসার উপন্যাসের পাতা, এই আগুন বুলবুলের আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করেছিল । বিরহ যন্ত্রণায় ডানা কাটা পরী অন্দরমহলে গুমরে মরেছিল । এক জানলা থেকে অন্য জানলায় ছুটে বেরিয়েছিল মুক্তির জন্য, কিন্তু সে তখনও জানত না অন্দরমহলের অদৃশ্য শিকলে ইতিমধ্যেই তার পা বাঁধা পড়েছে ।

ভয়রা কথা রাখে । জটায়ুর ডানা কেটে দেওয়ার মুহূর্তের চিত্রপট লেইট মোটিফ হয়ে ওঠে, পরীর ডানার ভাঙা অংশের রক্ত বা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া গোড়ালি থেকে রক্ত বেরিয়ে ছিটকে লাগে অন্দরমহলের দেওয়ালে । চিত্রপটের উপর, ঐতিহ্যের গায়ে । ইন্দ্রনীলের চোখেমুখে । সেই দৃশ্যের একটাই রং... লাল । খসে যাওয়া ডানার যন্ত্রণা অনুভবের আগেই অচেতন হয়ে যায় পরী, ঘুম ভাঙে আরও এক নৃশংসতার ভোরে । অন্দরমহলের বড় বড় পালঙ্কে তখনও রক্তের দাগ শোকায়নি । চিকিৎসক সুদীপ(অভিনয়ে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) সবেই সেই ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়ে গিয়েছে । পিতৃতান্ত্রিক বর্বরতায় , যৌন অত্যাচারে পরীর যোনি থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় । মৃত্যু হয় মুক্তির, মৃত্যু হয় ডানার । মৃত্যু হয় ইওটোপিয়ান রূপকথার । দৃশ্যে ফিরে আসে লাল রঙ । আকাশে লাল চাঁদ দেখা যায় । জন্ম হয় আরও এক পরীর, তবে তার ডানা নেই । আছে উল্টানো পা, ঔদ্ধত্য এবং নিয়ম ভেঙে বেরিয়ে আসার সাহস । পরজন্মে পালঙ্কের চারপাশে কাশবন, আর লাল রং । সেই রং রক্তের না আন্দোলনের না রূপকথার তা জানি না । 




ছবির আরও এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বিনোদিনী (অভিনয়ে পাওলি দাম)। বুলবুলের জা, ইন্দ্রনীলের জমজ ভাইয়ের স্ত্রী । যে বুলবুলের থেকে অনেক বড় হলেও তাকে বুলবুলকে বড় বউ বলে ডাকতে হয় । বিনোদিনী সেই নারী যে অন্দরমহলের মধ্যে থাকতে থাকতে নারীবিদ্বেষকে ইতিমধ্যেই গলদ্ধকরণ করেছে । বুলবুলের উপর অত্যাচারের পরও বুলবুলকে চুপ করে থাকতে শেখায় সে । তার সংলাপে আসে বশ্যতা ।


সময় আবার বছর 20 পর । বিলেত ফেরত সত্য সুদীপের সঙ্গে বুলবুলের বন্ধুত্ব দেখে হিংসা করে । তার পৌরুষ তাকে বর্বর বানায় । সুদীপ বুলবুলের পায়ের চিকিৎসা করার সময় সত্য সেখানে চলে আসে  এবং বুলবুলকে কটাক্ষ করে বলে, বৌদি আপনি নিজেকে পর্দার আড়ালও করেননি । তার প্রত্যেকটা কথায় ফিরে আসে পুরুষত্বের হিংস্রতা । বৌদির প্রতি সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ । এরই মধ্যে গ্রামে একটার পর একটা নৃশংস খুন হতে থাকে । সবাই ভাবে, সেই ডাইনি এসে খুন করে রক্ত খাচ্ছে । খুন হয় ইন্দ্রনীলের ভাই, খুন হয়ে যায় গ্রামের মাস্টার । সত্য সত্যের সন্ধান করে  । সেও খুঁজে বের করতে চায় কে এই খুন করছে । অন্তত, সে বিশ্বাস করত কোনও ডাইনি নয় , এই খুন মানুষের । অন্তত কোনও পুরুষ মানুষ...কারণ একজন নারী এত নৃশংস হতে পারে না ।


তার কথার সঙ্গে কন্ট্রাস্ট তৈরি করে ছবির দৃশ্য । হিন্দু পুরাণের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় । লাল রং এবং কালীপুজোর রাত ... আলো আঁধারি একটি খুনের স্মৃতি ভুলতে না ভুলতেই অন্য একটি খুন হয়ে যায় ।

ডাইনি নিয়ে যে গল্প কথা প্রচলিত রয়েছে, তা অবশ্যই পিতৃতান্ত্রিক । একজন মেয়ে যাকে অন্তত সমাজের নিয়মে বেঁধে ফেলা যায়নি তাকে ডাইনি বলে সম্বোধন করা হয়েছে যুগযুগ ধরে । ডাইনি সন্দেহে নির্দোষ মেয়েদের পুড়িয়ে মারার একাধিক খবর আমরা জেনেছি, কিন্তু আমরা কিছু করিনি । নৃশংসতাই কি ডাইনির আসল পরিচয় ? সে রক্ত খায় , সে মানুষ খুন করে ? কোনও দেবীও কি রক্ত পান করেননি ?

ডিসটোপিয়ান এক আখ্যান কাঠামো আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে । জোর করে দেখানো হয় নৃশংসতা, যন্ত্রণা, মৃত্যু । ছবির সঙ্গীত এবং উগ্র রঙ ভয়ের গল্প বুনন করে । এইদিকে ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফি, আলোর ব্যবহার, আর্ট ডিরেকশন বাস্তবেই এক পরাবাস্তববাদের ছবি আঁকে । সেখানে কখনও জানলা দিয়ে লাল আলো এসে পড়ে, কখনও বুলবুলের পালঙ্কের চারপাশে ভরে ওঠে কাশবন । আবার অত্যাচারের যন্ত্রণা আগুন হয়ে পুড়ে যায় কোনও দৃশ্যে ।

তবে ছবির ভয়ের জায়গাটা ঠিক কোথায়, অর্থাৎ ছবির যে জঁরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে--- হরর । সেই ভয়টা কোথায় ? ডিসটোপিয়ান রূপকথায়, বাংলার ইতিহাসে, খুনের নৃশংসতায় না কি জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের নিষ্ঠুর বর্বরতায় ? না কি সেই ডাইনির উল্টানো পায়ের পাতায় যেখানে পুরনো রক্তের দাগ লেগে রয়েছে ?


ছবির দৃশ্যপট, চিত্রনাট্য হয়তো আরও মজবুত হতে পারত । ঔদ্ধত্য ভয় দেখাতে পারত অন্দরমহলের কুঠুরিতে । নিজেকে পর্দার আড়াল থেকে বের করে আনা জমিদার বংশের গৃহিনীর চরিত্রের শাখা প্রশাখা আরও দূর বিস্তৃত হতে পারত । নারীবিদ্বেষী , ক্রীতদাসের মতো চরিত্র বিনোদিনী । সেই চরিত্রের শিকড়ে পৌঁছানো যেত । কিন্তু সেইসব ছবিতে হয়নি, বরং দাবানল এবং উগ্র লাল রঙ এইসব সত্যিকে ছাপিয়ে গিয়েছে কোথাও । ফিরেছে রূপকের জন্ম-মৃত্যু... পরাবাস্তববাদ স্মৃতির চৌকাঠে একাকিত্বের পাশে দাঁড় করিয়েছে ইন্দ্রনীলকে । তখন জমিদার বাড়ির উঠোনে শুধুই কাশবন । যেন শরতের সময়, যেন ষষ্ঠীর শুভ লগ্নে অকালবোধন । চক্ষু দান হবে দেবীর, তিনি অস্ত্র তুলে নেবেন । মাথা কেটে নেবেন আরও এক অত্যাচারীর...রক্ত পান করবেন তারপর ।  উল্টানো পায়ের পাতায় তখনও শুকনো রক্তের দাগ, দাবানলেই চিরন্তন সেই পরীর উপাখ্যান ।


ছবি সৌজন্যে - নেটফ্লিক্স এবং গুগল । (প্রত্যেকটি ছবি বুলবুল ছবি থেকে সংগৃহীত)

Thursday, 18 June 2020

নক্ষত্রপতন এবং বৃষ্টিবিকেল

যতবার শহর ছেড়ে এসেছি, একটা দুঃস্বপ্নের কথা মনে পড়েছে । সেই এক অদ্ভুত দুঃস্বপ্ব, যার কোনও শেষ নেই । একটা শুরু আছে কেবল । অন্তহীন এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে রয়েছি । মাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট এবং শহর ছেড়ে আসার অনুভূতিটা অনেকটা একরকম । আমার দোতলার ঘর, বারান্দার ফুল গাছ আর কাচের ভিতর রাখা রঙিন মাছ এসবই বাড়ি ছেড়ে আসার আগে শেষবারের জন্য স্মৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে জোর করে । আমাদের নিচের ঘর, বাবার শার্টের বোতাম অনেক পুরাতন হয়েছে । তার থেকেও পুরাতন হয়েছে বার্মা সেগুনের খাটটা । যদিও আমার কাছে সবথেকে পুরাতন নিচের ঘরের আলমারিটা, যার মধ্যে রাখা মায়ের গন্ধ । যে শাড়িগুলো ছুঁলে মনে হয় মাকে ছুঁয়ে দেখলাম । মায়ের চেয়ে আদিম এই পৃথিবীতে কী আছে, আমার জানা  নেই ।


আজও এইখানে বৃষ্টি এল । বিকেলে কাজ করার সময় মেঘ করে এল , মনে হল এইতো মন খারাপ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের জলে নৌকা ভাসানো যাবে । হঠাৎ করেই বাড়ি ছেড়ে আসার দিনটার কথা মনে পড়ল । ভোরবেলা এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য যখন গাড়িটা পাড়ার মধ্যে থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়টা । আমি পিছনে ঘুরে বাবাকে দেখার চেষ্টা করছি, যতদূর বাবাকে দেখা যায় । বাবাও দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে । এর থেকে যন্ত্রণার সময় আর হয় কি, জানা নেই । আমার ঠাম্মার সঙ্গে গল্প, আর নির্ভেজাল সন্ধ্যাগুলোর কথা মনে পড়ল । আমি কাগজের নৌকা বানালাম । বৃষ্টি নামতেই স্মৃতির নাম ওদের গায়ে লিখে ভাসিয়ে দিলাম, ওরাও নিজের মত ঠিকানা খুঁজে নিচ্ছিল । কেউ মায়ের শাড়ির আঁচলে মুছে নিচ্ছিল চোখ, কেউ বাবার সবথেকে পুরাতন শার্টের বোতাম চুরি করে পকেটে ভরছিল, কেউ ঠাম্মার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ছিল কিছু না ভেবেই । আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ঠায় বৃষ্টির জলে ভাসছি, আর দেখছি নৌকারা খুঁজে নিচ্ছে নিজেদের ঠিকানা । আমি এখনও বুঝিনি, আমায় হায়দরাবাদের ফ্ল্যাটের ছাদ বেশি প্রিয় না কি বাড়ির বারান্দা । আমার বইয়ের তাক বেশি প্রিয় না কি এক কামরার ভাড়ার এই ছোট্টো ফ্ল্যাটটা । আমি বুঝিনি আমার প্রিয় বন্ধুর নাম কী, আমি এখনও খুঁজে পাইনি আমার প্রেমিকের ঠিকানা । শুধু জানি, কোনও এক পাহাড়ি গ্রামে সেও তাঁর গিটার কাঁধে মেঘলা দুপুরের গান গায় । তারা দেখে রাতের আকাশ, বৃষ্টি হলে ছাদে ঘুরে আসে । আর জোৎস্নার রাতে ফিরে যায় জঙ্গল । আমি এখনও নিজেকে খুঁজি । বইয়ের পাতায়, খবরের নৃশংসতায়, আর রাত জাগা ফোনে । হয়তো আমিও সেই মনটাই হতে চেয়েছিলাম যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে । যার নাম হারিয়ে গেছে হাওয়ায় ।

 

এই বর্ণবিদ্বেষের পৃথিবীতে... দারিদ্র, যন্ত্রণা, বেকারত্ব, আত্মহননের পৃথিবীতে... এই অসাম্য আর ক্ষমতার লড়াইয়ে দুটো ডানার প্রয়োজন ছিল । যে ডানা দুটো বৃষ্টির জলেও ভেজে না । যে পাখিরা উড়ে যায় ঘর ছেড়ে, ফিরে আসে আরও এক দুই তিন শতক পর । আর পুরাতন গানদের বন্ধু বানিয়ে প্রত্যেকের রূপকথার গল্প লেখে তারাই । রাজকুমারির জন্য দেড়শো বছরের পুরাতন গান নিয়ে হেঁটে বেড়ায় পথিক  প্রেমিক । বাঁশি বাজায় আপন মনে, কিন্তু তাঁদের দেখা হয় না । অথচ, নন্দিনী ও বিশু পাগলের মত তারাও চিরন্তন । হয়তো সেই রূপকথা এখনও লেখা বাকি । এখনও বৃষ্টি আসা বাকি আরও অনেক । এখনও জোনাকিদের ঘুমাতে যাওয়া বাকি । এখনও সব তারারা পড়েনি খসে ।

 

কিন্তু আমরাও স্বপ্ন দেখবই । আমরা বলবই--- ভাবো, যে পৃথিবীতে কোনও দেশ নেই । মাকে ছেড়ে থাকার দুঃখকে সঙ্গে নিয়ে থাকব, কারণ অনেক দুঃখ যা ভোলার মত দুঃখ নেই । কয়েকটা যন্ত্রণা আপন হয়, শীতের সেই দুঃস্বপ্ন়টাও সেই একইরকম । যাকে ভোলার জন্য এখনও বৃষ্টি হলেই শহর টানে, এখনও মেঘলা আকাশ উড়িয়ে আনে চিঠি । আমি একের পর এক নৌকা ভাসাই, ট্রলি ব্যাগ থেকে বের করে নিই মায়ের শাড়ি । জানি, ঘুম থেকে উঠেই দেখব মা ফিরে এসেছে আরও এক মেঘলা বিকেল হয়ে ... খসে গিয়েছে আরও একটা তারা ... টবের গাছে নতুন ফুল এসেছে পরবর্তী সকালে ...

Saturday, 23 May 2020

একটি ন্যূনতম ক্ষতি আখ্যান

আমফানের ল্যান্ডফল হওয়ার আগেরদিন সুন্দরবনের একটা খবর সম্পাদনা করেছিলাম। সংবাদের মূল লক্ষ্য ছিল, সিঁদুরে মেঘ দেখছে সুন্দরবন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে প্রতিমুহূর্তে অস্ত্বিত্বের জন্য লড়ছে। ঘোড়ামারাসহ সুন্দরবনে একাধিক দ্বীপ আছে যারা অস্তিত্ব সংকটে। একটুকু আঁকড়ে লড়ে যাচ্ছে নদীর পারের বসতিগুলো। আমফান আসার পর কী হয়েছে ভাবতে পারি না, যারা ইন্টারভিউতে কথা বলেছিল...যারা বলেছিল, "গরিব তাই জীবনের নিশ্চয়তা নেই!"... সেই মানুষগুলো এখন কোথায়? জানি না ৷ আমফানের আগের বাংলা এবং আমফান পরবর্তী বাংলা এক নয় ৷ বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা...হয়তো প্রায় ধ্বংসাবশেষ সুন্দরবন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, যেকোনও সংবাদমাধ্যমের কাছে সেই ধ্বংস, সেই যন্ত্রণা, সেই সর্বহারাদের গল্প গুরুত্ব পায় না। যতটা কলকাতা পায়।




আমরা দক্ষিণের শহরতলি৷ গতকাল বাইরে বেরিয়েছিলাম। দেখলাম ভেঙেচুরে পড়ে আছে আমার এই ছোটো শহরটা। কতক্ষণ বিদ্যুৎ পরিষেবা নেই, কতক্ষণ কাছের মানুষগুলোকে যোগাযোগ করতে পারিনি আর হিসেব থাকছিল না। এক একটা টিউবওয়েলে বড় লাইন। কারণ পানীয়জল নেই আমাদের। তখন কোথায় সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং কোথায় কী? ইতিমধ্যেই বাঁচার লড়াই শুরু হয়েছে। তখন ইত্যাদি অসুখ মাথায় আসে না...খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের বাইরে আসলে মানবসভ্যতা কিছু চায়নি। বাকি যা কিছু একটা মরীচিকার মত। গতকাল প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সংযোগ আংশিকভাবে ফিরেছে। এখনও মোবাইল ইন্টারনেট কোনওভাবে চলছে। অন্তত দুইদিনে একথা স্পষ্ট...সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে গেলেও বা দুটি ছবি শেয়ার করার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা প্রয়োজন। আসলে যারা পোস্ট করতে পারেনি বা পারছে না যাদের যোগাযোগ করা যায়নি এখনও তাদের কী পরিস্থিতি কিছু জানি না।

আমার শহরতলির এরকম অসহায় মুখ আমায় কখনও দেখতে হবে ভাবিনি। আমি এও ভাবিনি আমার জেলা এইভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। আমি কখনও ভাবিনি আমার য়ুনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের লাল কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো উপড়ে যাবে কিংবা ভেঙে যাবে লাইব্রেরির সামনের স্কাল্পচার। আমি ভাবিনি কলেজ স্ট্রিটের বইগুলো ডুবে যাবে এভাবেই। আমি কল্পনা করতে পারিনি কুমোরটুলির এখন অবস্থা কী? আমি জানি না আমার সেই বন্ধুরা কেমন আছে যাদের এখনও যোগাযোগ করতে পারিনি...



আমার এক বন্ধু আমায় গতকাল মেসেজে লিখে পাঠিয়েছিল,ওদের হাউসিং-এর সামনে একটা হলুদ রাধাচূড়া গাছ ছিল। হলুদ ফুলে বিছিয়ে থাকত চারধার। এখন সেখানে হলুদ রাধাচূড়ার মৃতদেহটাই আছে। আমিও কখনও ভাবিনি, ছোটো থেকে যে গাছটা দেখতে দেখতে বড় হয়েছি সেই গাছটাই ওভাবে ভেঙেচুরে রাস্তায় পড়ে থাকবে। যে রাস্তায় ছুটে ছুটে খেলে বেরিয়েছি সেই রাস্তার অংশ ভেঙে পড়ে থাকবে। আমি ভাবিনি। আমরা গাছেদের ভালবেসেছি, আমরা কলেজ স্ট্রিট ভালবেসেছি, বইয়ের গন্ধ ভালবেসেছি। আমরা ভালবেসেছি ক্যাম্পাস, শহরের প্রত্যেকটা গলি আর প্রত্যেকটা মানুষকে। না দেখা সুন্দরবনকেও ভালবেসেছি। তাই তো এত যন্ত্রণা হচ্ছে । কষ্ট হচ্ছে আমার বাংলার জন্য । পরিস্থিতি একটু সামলে নিয়ে 'পারেঞ্জার্স'-র পক্ষ থেকে খুব দ্রুত কাজ শুরু হবে। কারণ, আমরা প্রত্যেকে পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত।

আমার কেরলের সহকর্মী আমায় অনেকবার ফোন করেছে। মেসেজ এসেছে বিদেশের বন্ধুর থেকেও...জানতে চেয়ে আমরা কেমন আছি? বাংলা কেমন আছে? আবার অনেকেই বাঙালির উপর ঘেন্না থেকে পরিস্থিতিতে হেসেছে ৷

ফেসবুকে আমার বন্ধুরা অনেকেই শেয়ার করেছেন দেখলাম কয়েকটি স্ক্রিনশট। যেখানেই এই বিষয়টি দেখা গিয়েছে যে নির্দিষ্ট এক বলয়ের লোকজন বেশ খুশি। পশ্চিমবাংলার এই পরিণতিতে তারা বেশ খুশি। কেউ মনে করেন এটা শিবের রাগ, কেউ মনে করেন বাংলার পাপের কারণ। কেউ বলেছেন, "ন্যূনতম ক্ষতি!" এদের চিনে রাখা উচিত কি না জানি না, এদের মানুষ বলে মনে করি না। আর অমানুষ দেখতে মানুষের মতই। আমাদের অবাক লাগে কেন জানেন, কারণ বাংলার মানুষ এমনভাবে ভাবতে শেখেনি। বাংলা জানে, অন্যের জন্য লড়াই করতে...বাঙালি জানে অন্যের জন্য গর্জে উঠতে। কেরলের বন্যায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে দুবার ভাবে না। কিংবা উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে সংঘর্ষের সময় কলকাতার কয়েকজন ছেলেমেয়ে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল যখন? অন্য রাজ্যের কষ্টে চোখের জল ফেলেছিল বাঙালি। ভারতের যে নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্র অন্যায় করবে ভেবেছিল, তাদের হয়ে আওয়াজ উঠিয়েছিল বাঙালি। একসঙ্গে বলে উঠেছিল, "আমরা কাগজ দেখাব না!" এগুলো আমাদের শিখিয়ে দিতে হয়নি কোনওদিন। এগুলো আমরা এমনিই জানি। তাই অন্যের যন্ত্রণায় কোনওদিন হাসতে পারব না। অশিক্ষিতর মতো বলে দিতে পারব না, মিডিয়া কভারেজ পায়নি তাই এত চিৎকার করছে দেখে হাসি পাচ্ছে। উল্টে সেই রাজ্যটাই যদি কোনও ঘটনায় মিডিয়া কভারেজ না পায় আমরা প্রতিবাদের সুর তুলবই। আমাদের রক্তে বিপ্লব আছে, তা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন জানে। ৭০-এর বাংলাদেশ জানে, ভারতও জানে। তাই আমরা ঠিক উঠে দাঁড়াবই...হয়তো আজ না কিন্তু কয়েকদিন পরেই। সুন্দরবনের মানুষ হাসবে। কাকদ্বীপ, সাগরদ্বীপ আবার গড়ে নেবে নিজেকে। অসুখ ক্লান্ত জেলাগুলো ঠিক উঠে দাঁড়াবে ৷ আমার শহরতলির অসুখ ঠিক হবে। আবার ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল ফুটবে । বন্ধুর হাউসিংয়ের সামনে রাধাচূড়ার মৃতদেহ থেকেই জন্ম নেবে নতুন প্রাণ। কলেজস্ট্রিটের দোকানগুলোয় ভিড় হবে আবার। ধ্বংসস্তূপ থেকেই জেগে উঠবে বাংলা। হাসবে, আর হ্যাঁ এও জেনে রাখুন আপনার বিপদে পাশে গিয়ে দাঁড়াবে। আমরা উঠে দাঁড়াতে জানি কারণ আমাদের মেরুদণ্ডটা গুঁড়িয়ে যায়নি যেমন সেই 'তাদের' অনেকদিন আগেই গেছে...




ছবি ফেসবুক থেকে নেওয়া। আমায় ক্ষমা করবেন, জানি না এই ছবি কার বা কাদের তোলা তাই ক্রেডিট দিতে পারলাম না।